09/02/2026
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। এই একই দিনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং জুলাই সনদ ও সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। সংস্কার কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সর্বমোট ৮৪ টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। এরমধ্যে ৪৭ টি সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত এবং বাকি ৩৭ টি বিভিন্ন আইন ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হবে। চলুন জেনে আসি প্রস্তাবনা গুলো কি কি-
✔️ জাতীয় পরিচয় ও রাষ্ট্রের মূলনীতি
১. আমাদের নাগরিক পরিচয় হবে ‘বাংলাদেশি’।
২. রাষ্ট্রভাষা বাংলা থাকবে, তবে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষাকে সাংবিধানিক সুরক্ষা ও মর্যাদা প্রদান।
৩. রাষ্ট্রের মূলনীতিতে ‘সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার’-এর সাথে ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতি’ যুক্ত করা।
৪. ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানকে সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান।
✔️ ক্ষমতার ভারসাম্য: রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী
৫. কোনো ব্যক্তি জীবনে ২ মেয়াদের (সর্বোচ্চ ১০ বছর) বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না।
৬. প্রধানমন্ত্রী একই সাথে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রধান বা দলীয় পদে থাকতে পারবেন না।
৭. রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা।
৮. রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের পাশাপাশি পরোক্ষভাবে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটানো।
৯. রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা (অনুচ্ছেদ ৪৯) সীমাবদ্ধ করা, বিশেষ করে রাজনৈতিক বিবেচনায় দণ্ড মওকুফ বন্ধ করা।
১০. প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ছাড়াই রাষ্ট্রপতি যাতে প্রধান বিচারপতি ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ দিতে পারেন, সেই ক্ষমতা প্রদান।
✔️ জাতীয় সংসদ ও আইনসভা
১১. দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা প্রবর্তন (উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষ)।
১২. নিম্নকক্ষে ৩০০ আসন থাকবে, যা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হবে।
১৩. উচ্চকক্ষে ১০০ আসন থাকবে, যা ভোটের আনুপাতিক হারে (PR) মেধা ও দক্ষতার ভিত্তিতে গঠিত হবে।
১৪. সংরক্ষিত নারী আসন সরাসরি ভোটে এবং ভোটের আনুপাতিক হারে নির্ধারণ।
১৫. বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার এবং গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন বাধ্যতামূলক করা।
১৬. সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন- যাতে সংসদ সদস্যরা বাজেট এবং অনাস্থা প্রস্তাব বাদে অন্য সব বিষয়ে নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দিতে পারেন।
১৭. ‘না’ ভোট বা নেতিবাচক ভোটের বিধান ফিরিয়ে আনা।
১৮. সংসদের মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার আগে ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর বদলে রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করা।
✔️ নির্বাচন ও তত্ত্বাবধায়ক সরকার
১৯. সংবিধানে ‘নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন ও স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা।
২০. নির্বাচন কমিশন নিয়োগে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ ‘বাছাই কমিটি’ গঠন (স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা)।
২১. নির্বাচন কমিশনের পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
✔️ বিচার বিভাগ
২২. বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে সম্পূর্ণ আলাদা ও স্বাধীন সচিবালয়ের অধীনে আনা।
২৩. একটি ‘স্বাধীন বিচার বিভাগীয় নিয়োগ কমিশন’ গঠন করা।
২৪. সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলকে কার্যকর ও শক্তিশালী করা।
২৫. বিচারকদের দলীয় আনুগত্য বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকে ‘অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য করা।
২৬. উচ্চ আদালতের বিচারক নিয়োগে মেধা ও স্বচ্ছতার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন।
✔️ মৌলিক অধিকার ও জরুরি অবস্থা
২৭. ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতার বদলে মন্ত্রিসভার অনুমোদনের বাধ্যবাধকতা।
২৮. সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারকে অলঙ্ঘনীয় করা।
২৯. ইন্টারনেট ও ডিজিটাল অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া।
৩০. (অনুচ্ছেদ ২১ সংশোধন): সরকারি কর্মচারীদের দায়বদ্ধতা এবং জনগণের সেবক হিসেবে তাদের ভূমিকা কঠোরভাবে সংজ্ঞায়িত করা।
৩১. (জুলাই বিপ্লব): সংবিধানের প্রস্তাবনায় (Preamble) ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানকে ‘জুলাই বিপ্লব’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা।
৩২. (মূলনীতি বাস্তবায়ন): নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ও সুবিচার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর আইনি কাঠামো তৈরি করা।
৩৩. (বহুত্ববাদ): বাংলাদেশ একটি বহু-জাতি, বহু-ধর্মী, বহু-ভাষী ও বহু-সংস্কৃতির দেশ—এই মর্মে সাংবিধানিক অঙ্গীকার।
৩৪. (ক্ষুদ্র জাতিসত্তার অধিকার): সকল ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষা ও ঐতিহ্য রক্ষায় রাষ্ট্রের ওপর বিশেষ দায়বদ্ধতা।
৩৫. (জরুরি অবস্থা সংশোধন): কেবল যুদ্ধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্র ব্যতীত জরুরি অবস্থা জারি নিষিদ্ধ করা।
৩৬. (সংসদীয় অনুমোদন): জরুরি অবস্থা ঘোষণার ৭২ ঘণ্টার মধ্যে সংসদের (উচ্চ ও নিম্নকক্ষ) দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের সম্মতি বাধ্যতামূলক করা।
৩৭. (বিরোধী দলের অংশগ্রহণ): জরুরি অবস্থা ঘোষণার আগে মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিরোধী দলীয় নেতার উপস্থিতি বা পরামর্শ গ্রহণ বাধ্যতামূলক।
৩৮. (মৌলিক অধিকার রক্ষা): জরুরি অবস্থাতেও জীবনের অধিকার (৩২ অনুচ্ছেদ) এবং বিচারের অধিকার (৩৫ অনুচ্ছেদ) খর্ব না করা।
৩৯. (সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া): সংবিধানের যেকোনো অংশ সংশোধনের জন্য উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের ভোট প্রয়োজন হবে।
৪০. (গণভোটের বিধান): গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদসমূহ (৮, ৪৮, ৫৬ এবং ১৪২) সংশোধনের ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক করা।
৪১. (স্থায়ী সাংবিধানিক রক্ষাকবচ): নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে সংবিধানের ‘মৌলিক কাঠামো’ হিসেবে ঘোষণা করা।
৪২. (৭-ক অনুচ্ছেদ বাতিল): সংবিধান স্থগিত করার বিতর্কিত ৭-ক অনুচ্ছেদ বাতিল বা সংস্কার।
৪৩. (৭-খ অনুচ্ছেদ বাতিল): সংবিধানের অনেক অংশকে 'অপরিবর্তনযোগ্য' করে রাখা ৭-খ অনুচ্ছেদ বাতিল করা।
৪৪. (ন্যায়পাল): ৭৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী 'ন্যায়পাল' নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু ও তাকে স্বাধীন ক্ষমতা প্রদান।
৪৫. (স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ): জেলা ও উপজেলা পরিষদকে সরাসরি ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ন্যস্ত ও আর্থিক ক্ষমতা প্রদান।
৪৬. (প্রশাসনিক জবাবদিহিতা): রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে ‘সিটিজেন চার্টার’ এবং নিয়মিত গণ-শুনানি বাধ্যতামূলক করা।
৪৭. (উত্তর-মেয়াদ সীমাবদ্ধতা): প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের পর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আর কোনো রাষ্ট্রীয় লাভজনক পদে নিয়োগ পাবেন না।
৪৮. (রাষ্ট্রপতির একক ক্ষমতা): মানবাধিকার, তথ্য ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান নিয়োগে রাষ্ট্রপতিকে একক ক্ষমতা প্রদান।
✔️ আইনি ও প্রশাসনিক সংস্কার
৪৯. একটি ৯ সদস্যের ‘স্বাধীন পুলিশ কমিশন’ গঠন করা।
৫০. পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তর।
৫১. পুলিশের বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির জন্য সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি।
৫২. রাব বা অনুরূপ বাহিনীর গঠনতন্ত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা।
৫৩. পুলিশি নির্যাতনে মৃত্যু বা গুমের ঘটনার বিচারের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।
৫৪. দুদককে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা ও পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান।
৫৫. সরকারি নিয়োগ ও কেনাকাটা (E-GP) শতভাগ ডিজিটালাইজড করা।
৫৬. মন্ত্রী, এমপি ও সরকারি কর্মকর্তাদের প্রতি বছর ‘সম্পদ বিবরণী’ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।
৫৭. মানিলন্ডারিং ও পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনতে আইনি কাঠামোর সংস্কার। ৫৮. পিএসসি (PSC)-কে সংস্কার করে বিসিএস নিয়োগে মেধার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন।
৫৯. প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের জন্য কঠোর ‘আচরণবিধি’ প্রণয়ন। ৬০. প্রতিটি সরকারি দপ্তরে ‘ন্যায়পাল’ (Ombudsman) নিয়োগ।
৬১. শিক্ষাক্ষেত্রে জিডিপির ন্যূনতম ৪-৫% বরাদ্দ রাখা।
৬২. বিশ্ববিদ্যালয়ে লেজুড়বৃত্তি ছাত্র ও শিক্ষক রাজনীতি বন্ধের গাইডলাইন।
৬৩. কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা।
৬৪. (দুদক স্বায়ত্তশাসন): দুদকের নিজস্ব বাজেট ও নিরপেক্ষ জনবল নিয়োগের পূর্ণ ক্ষমতা।
৬৫. (স্বচ্ছ প্রকিউরমেন্ট): সরকারি কেনাকাটায় নাগরিক পর্যবেক্ষণের জন্য ‘ওপেন কন্ট্রাক্টিং’ ডেটা সিস্টেম।
৬৬. (পরিবারসহ সম্পদ প্রকাশ): কর্মকর্তাদের পাশাপাশি তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা।
৬৭. (টাকা উদ্ধারে ট্রাইব্যুনাল): পাচার হওয়া টাকা ফেরাতে ‘হাই-পাওয়ারড টাস্কফোর্স’ ও বিশেষ জুডিশিয়াল ট্রাইব্যুনাল।
✔️ ব্যাংকিং ও অর্থনৈতিক সংস্কার
৬৮. একটি স্থায়ী ‘ব্যাংকিং কমিশন’ গঠন করা।
৬৯. ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের জন্য কঠোর শাস্তি ও নির্বাচনে অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা।
৭০. শেয়ার বাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও বিগত বছরের কেলেঙ্কারির বিচার।
৭১. বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের জন্য স্বাধীন সার্চ কমিটির বিধান।
৭২. বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে ‘প্রতিযোগিতা কমিশন’কে বিচারিক ক্ষমতা প্রদান।
✔️ স্থানীয় সরকার ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ
৭৩. (আর্থিক বিকেন্দ্রীকরণ): জেলা ও উপজেলা পরিষদকে নিজস্ব রাজস্ব আদায়ের ক্ষমতা প্রদান।
৭৪. স্থানীয় রাজস্বের একটি নির্দিষ্ট অংশ সরাসরি স্থানীয় পরিষদের ফান্ডে জমা হওয়ার আইনি গ্যারান্টি।
৭৫. নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা বিচার বিভাগের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া।
সুশাসন ও মানবাধিকার
৭৬. (ন্যায়পাল ও বিচারিক ক্ষমতা): দুর্নীতি দমনে ‘ন্যায়পাল’কে সরাসরি তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা।
৭৭. সংবাদপত্রের স্বাধীনতার পরিপন্থী সকল আইন (যেমন প্রেস কাউন্সিল আইনের বিতর্কিত ধারা) সংস্কার।
৭৮. ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন’ বাতিল করে নাগরিকের ডেটা সুরক্ষা ও প্রাইভেসি আইন করা।
৭৯. শক্তিশালী ‘জাতীয় সংখ্যালঘু কমিশন’ গঠন।
৮০. মানবাধিকার কমিশনকে (NHRC) আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে সরাসরি তদন্তের ক্ষমতা প্রদান।
✔️ সামাজিক সুরক্ষা ও মনিটরিং
৮১. শ্রমিকদের জন্য ‘লিভিং ওয়েজ’ (সম্মানজনক ন্যূনতম মজুরি) নিশ্চিত করা।
৮২. নদী ও বন রক্ষায় কঠোর পরিবেশ আইন ও পরিবেশ আদালতকে শক্তিশালী করা।
৮৩. সরকারি হাসপাতালে অব্যবস্থাপনা বন্ধ ও ‘ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ’ নিশ্চিত করা।
৮৪. ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপ (OGP)-এ বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।