17/07/2026
ভ্যাটের ৮টি বৈশিষ্ট্য সর্বশেষ এসআরও ও আইন অনুযায়ী -
১. আদর্শ ভ্যাট হার ১৫%: বাংলাদেশের মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২ (Value Added Tax and Supplementary Duty Act, 2012) অনুযায়ী দেশের আদর্শ ভ্যাট হার নির্ধারণ করা হয়েছে ১৫%। এই হারটি বেশিরভাগ পণ্য ও সেবার উপর প্রযোজ্য। তবে আইনের তফসিল অনুযায়ী কিছু ক্ষেত্রে হ্রাসকৃত হার প্রযোজ্য যেমন ১০%, ৭.৫%, ৫%, ২.৪%, ২%, ১.৫% বা ০%। সর্বশেষ এসআরও অনুযায়ী (যেমন SRO No-65-Law/2025/278-VAT, dated ১৯/০২/২০২৫) বিস্কুট ও কেকের উপর ভ্যাট হার ৭.৫% নির্ধারণ করা হয়েছে। SRO No-52-Law/2026/VAT, dated ১৫/০২/২০২৬ অনুযায়ী এলপি গ্যাসের আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট ৭.৫% নির্ধারণ করা হয়েছে। SRO No-39-Law/2025/275-VAT, dated ২২/০১/২০২৫ অনুযায়ী হোটেল ও রেস্তোরাঁ, মোটর গ্যারেজ ও ওয়ার্কশপ, মিষ্টির দোকান, রেডিমেড গার্মেন্টসের পুরাতন ভ্যাট হার পুনঃস্থাপন করা হয়েছে। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ১৫ এবং তফসিল-১, তফসিল-২ ও তফসিল-৩ এ এই হারসমূহ বিস্তারিত বর্ণনা করা আছে।
২. ভ্যাট হলো ভোক্তা কর: ভ্যাট মূলত একটি ভোক্তা কর (Consumer Tax), যা চূড়ান্ত ভোক্তার ওপর আরোপিত হয়। যদিও আইনগতভাবে পণ্য বা সেবার সরবরাহকারী (Supplier) কর আদায় ও জমা দেওয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত, কিন্তু আসলে এই করের বোঝা শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তার ওপরেই বর্তায়। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৩ এবং ধারা ৫ অনুযায়ী, সরবরাহকারী করদাতা হিসেবে নিবন্ধিত হয়ে ভ্যাট আদায় ও সরকারি কোষাগারে জমা দেয়, কিন্তু এটি পণ্য বা সেবার মূল্যের সাথে ভোক্তার কাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। ফলে ভ্যাটের চূড়ান্ত বোঝা ভোক্তার ওপরেই পড়ে।
৩. পরোক্ষ কর: ভ্যাট একটি পরোক্ষ কর (Indirect Tax)। পরোক্ষ কর হলো সেই কর যা সরকার সরাসরি করদাতার কাছ থেকে নয়, বরং পণ্য বা সেবার মাধ্যমে মধ্যস্থতাকারীর দ্বারা আদায় করে। এটি সরাসরি কর (Direct Tax) যেমন আয়কর থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ২(১)-এ "সরবরাহ" (Supply) সংজ্ঞায়িত হয়েছে এবং ধারা ৩ অনুযায়ী পণ্য বা সেবার সরবরাহের উপর ভ্যাট আরোপিত হয়। ব্যবসায়ীরা পণ্য বা সেবা বিক্রির সময় ভ্যাট আদায় করে সরকারকে জমা দেয়, ফলে করদাতা ও কর প্রদানকারী ভিন্ন ব্যক্তি হয়।
৪. রেয়াত ব্যবস্থা কার্যকর: ভ্যাট ব্যবস্থার অন্যতম মূল বৈশিষ্ট্য হলো রেয়াত ব্যবস্থা বা ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট (Input Tax Credit) পদ্ধতি। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৪৬ এবং ধারা ৪৭ অনুযায়ী, নিবন্ধিত ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে ক্রয়কৃত পণ্য বা সেবার উপর প্রদত্ত ভ্যাট (Input VAT) তাদের বিক্রয়ের উপর আদায়কৃত ভ্যাট (Output VAT) থেকে বিয়োগ করতে পারেন। তবে শুধুমাত্র ১৫% হারের ইনপুট ভ্যাট চালানের বিপরীতে রেয়াত গ্রহণযোগ্য হ্রাসকৃত হারের (যেমন ৫%, ৭.৫%, ১০%) ইনপুট ভ্যাট রেয়াতযোগ্য নয়। এর ফলে প্রতিটি সরবরাহ পর্যায়ে শুধুমাত্র মূল্য সংযোজনের উপরই কর প্রযোজ্য হয়, এবং দ্বৈত করারোপ (Double Taxation) এড়ানো যায়। তবে রেয়াত গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট চালান (Tax Invoice) সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক এবং নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়।
৫. অডিট বেস সিস্টেম: মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৮৫, ৮৬ এবং ৮৭ অনুযায়ী জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) বা মনোনীত কর কর্মকর্তারা নিবন্ধিত ব্যবসায়ীদের হিসাবপত্র, রেকর্ড, চালান, রিটার্ন এবং অন্যান্য নথিপত্র যাচাই-বাছাই (Audit) করতে পারেন। অডিটের উদ্দেশ্যে করদাতাকে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথি সরবরাহ করতে হয়। ধারা ৮৮ অনুযায়ী অডিটের মাধ্যমে যদি কোনো অতিরিক্ত কর বা জরিমানা নির্ধারিত হয়, তবে করদাতাকে তা পরিশোধ করতে হয়। সর্বশেষ ফিন্যান্স অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ (Ordinance No. 28 of 2025) অনুযায়ী জরিমানার পরিমাণও সংশোধিত হয়েছে যেমন চালান না দেওয়ার জন্য জরিমানা ১০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা নিশ্চিত করে যে ব্যবসায়ীরা সঠিকভাবে ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করছেন এবং নির্ধারিত কর সঠিকভাবে জমা দিচ্ছেন।
৬. একাউন্ট বেস সিস্টেম: ভ্যাট ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে একাউন্ট বেসড বা হিসাবনির্ভর (Accounts-based System)। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৬৪, ৬৫ এবং ৬৬ অনুযায়ী প্রতিটি নিবন্ধিত ব্যবসায়ীকে নির্দিষ্ট হিসাবপত্র ও নথি সংরক্ষণ করতে হয়, যার মধ্যে রয়েছে ক্রয়-বিক্রয় রেজিস্টার, চালান বই (Tax Invoice), ক্রেডিট নোট, ডেবিট নোট, মাশুল বই (Mushak) এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি। ধারা ৬৪ অনুযায়ী প্রতিটি সরবরাহের জন্য নির্দিষ্ট চালান ইস্যু করতে হয়, যাতে সরবরাহকারী ও গ্রহীতার তথ্য, পণ্য/সেবার বিবরণ, পরিমাণ, মূল্য এবং ভ্যাটের পরিমাণ উল্লেখ থাকে। এই হিসাবপত্র ও চালান পরবর্তীতে মাসিক রিটার্ন দাখিল ও অডিটের ভিত্তি হয়। সর্বশেষ এসআরও অনুযায়ী (যেমন SRO No-158-Ain/2025/286-Mushak, dated ০২/০৬/২০২৫) ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বিধিমালা, ২০১৬-এও সংশোধনী এসেছে।
৭. স্বচ্ছতা ও হিসাববক্ষণ বিধান: ভ্যাট ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর স্বচ্ছতা (Transparency) এবং কঠোর হিসাববক্ষণ বিধান (Bookkeeping Provisions)। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর ধারা ৬৪ থেকে ৬৭ পর্যন্ত বিস্তারিতভাবে হিসাব সংরক্ষণের বিধান রয়েছে। প্রতিটি লেনদেনের জন্য নির্দিষ্ট চালান ইস্যু করা বাধ্যতামূলক, যা পরবর্তীতে যাচাইযোগ্য। ধারা ৬৫ অনুযায়ী ক্রয় ও বিক্রয় রেজিস্টার সংরক্ষণ করতে হয়, ধারা ৬৬ অনুযায়ী চালান বই ও মাশুল বই সংরক্ষণ করতে হয়, এবং ধারা ৬৭ অনুযায়ী এইসব নথি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (সাধারণত ৫ বছর) সংরক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। সর্বশেষ ফিন্যান্স অর্ডিন্যান্স, ২০২৫ অনুযায়ী নথি না রাখার জন্য জরিমানা ১০,০০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই বিধানসমূহ ভ্যাট ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক করে তোলে।
৮. রেগ্রেসিভ প্রকৃতি (ক্ষেত্র বিশেষে): সাধারণভাবে ভ্যাটকে রেগ্রেসিভ কর (Regressive Tax) হিসেবে বিবেচনা করা হয়, কারণ এটি সম্পদের পরিমাণ বা আয়ের হার নির্বিশেষে সবার উপর একই হারে প্রযোজ্য। নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য ভ্যাতের বোঝা তাদের মোট আয়ের তুলনায় অনেক বেশি হয়, যেখানে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের জন্য এটি তুলনামূলকভাবে কম। তবে বাংলাদেশের ভ্যাট আইনে কিছু ক্ষেত্র বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে যা এই রেগ্রেসিভ প্রকৃতি কিছুটা প্রশমিত করে যেমন অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসী পণ্যের উপর সম্পূরক শুল্ক (Supplementary Duty) আরোপ, অপরিহার্য পণ্য ও সেবায় শূন্য হারে ভ্যাট বা ভ্যাট অব্যাহতি প্রদান। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন, ২০১২-এর তফসিল-১ এবং তফসিল-২-এ এই বিভিন্ন হার ও অব্যাহতির বিধান বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা আছে। সর্বশেষ বিভিন্ন এসআরও (যেমন SRO No-158 থেকে SRO No-182-Ain/2025, dated ০২/০৬/২০২৫) অনুযায়ী বিভিন্ন পণ্য ও শিল্পের জন্য ভ্যাট অব্যাহতি ও সম্পূরক শুল্ক ছাড় দেওয়া হয়েছে, যা কিছুটা হলেও রেগ্রেসিভ প্রকৃতি প্রশমিত করে। ফলে ক্ষেত্র বিশেষে ভ্যাট ব্যবস্থা কিছুটা প্রগ্রেসিভ (Progressive) রূপ ধারণ করতে পারে, যদিও মৌলিকভাবে এটি রেগ্রেসিভ প্রকৃতির।