30/07/2026
সন্তানকে সম্পত্তি লিখে দেওয়ার পর সন্তান বাবা-মাকে না দেখলে রাস্তায় বসতে হবে? নাকি প্রতিকার আছে?
পিতামাতা ও সন্তানের সম্পত্তি নিয়ে আমাদের সমাজে একটা নীরব কষ্ট প্রায়ই দেখা যায়। জীবনের সবটুকু সঞ্চয় দিয়ে কেনা জমি বা বাড়ি সন্তানকে লিখে দিলেন, আর তারপর নিজের ঘরেই পরবাসী হয়ে গেলেন, এমন ঘটনা আমাদের সমাজে অচেনা নয়! দুঃখজনক হলেও সত্যি, সম্পত্তি পাওয়ার পর অনেক সন্তানই বাবা-মায়ের খবর নেয় না, বা তাদের বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটে।
প্রচলিত মুসলিম আইনে একবার নিঃশর্ত 'হেবা' (দান) করে দিলে পিতা-মাতার আর কিছুই থাকে না, তার হাত শূন্য হয়ে যায়। আবার অনেকেই ভাবেন 'ওসিয়ত' (উইল) করবেন, কিন্তু সেখানেও তো সীমাবদ্ধতা! মুসলিম আইনে ১/৩ অংশের বেশি ওসিয়ত করা যায় না, আর মৃত্যুর পর সব ওয়ারিশ রাজি না থাকলে সেই ওসিয়ত অকার্যকর হয়ে পড়ে। অন্যদিকে হিন্দু আইনে উইল করলেও মৃত্যুর পর আদালত থেকে 'প্রোবেট' করানোর এক দীর্ঘমেয়াদী ঝামেলা পোহাতে হয়।
তাহলে সমাধান কোথায়?
সমাধানের পথ দেখিয়েছিল ১৯৬৩ সালের পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্টের একটি ল্যান্ডমার্ক রায় (Dilshad Begum v. Muhammad Nawaz), যা স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও আইনি নজির হিসেবে বহাল আছে। আদালত সেখানে বলেন, মুসলিম আইনেই ‘Heba-ba-shart-ul-iwaj’ বা শর্তযুক্ত দানের মাধ্যমে "Life Interest" (আজীবন স্বত্ব) তৈরি করা সম্ভব। আদালত স্পষ্ট করেন যে, মূল মালিকানা (Corpus) হস্তান্তরের পাশাপাশি কেবল ভোগদখলের অধিকার (Usufruct) শর্তযুক্ত করে দান করা মুসলিম আইনেই সম্ভব। সম্পত্তির মূল মালিকানা সন্তানকে দিয়েও ভোগদখল ও ব্যবহারের অধিকার বাবা-মা নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারেন। দলিলে শর্ত থাকবে, সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়া হলেও বাবা-মা যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন তারা এতে বসবাস করবেন এবং এর থেকে আসা আয় ভোগ করবেন।
এতে বাবা-মায়েরা ঠিক কী সুবিধা পাবেন?
১. জীবদ্দশায় নিশ্চিত আশ্রয়: সম্পত্তি সন্তানকে লিখে দেওয়ার পরও বাবা-মাকে কেউ নিজ ভিটা থেকে উচ্ছেদ করতে পারবে না।
২. যৌথ সম্মতি ছাড়া বিক্রি নয়: বাবা-মার জীবনকালে তাদের এবং সন্তানের, উভয়ের অনুমতি ছাড়া সম্পত্তি বিক্রি করা যাবে না।
৩. জরুরি প্রয়োজনে আইনি সুরক্ষা: চিকিৎসার মতো জরুরি প্রয়োজনে জমি বিক্রির দরকার হলে এবং সন্তান রাজি না থাকলে, সরাসরি জেলা জজের (District Judge) কাছে আবেদন করে অনুমতি নিয়ে তা বিক্রি করা যাবে।
এর আগে একটি সেমিনারে আমাদের আইনমন্ত্রী মো: আসাদুজ্জামান স্যারের এই বিষয়ক আলোচনা শুনেছি। আজ দেখলাম তিনি এই আইনি নীতিটিকেই এবার স্থায়ী আইনের রূপ দিতে যাচ্ছেন। তিনি সম্পত্তি হস্তান্তর আইন (Transfer of Property Act) সংশোধনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই যুগান্তকারী সংস্কারটি বাস্তবায়িত হলে দেওয়ানি আদালতের হাজার হাজার মামলার চাপ যেমন কমবে, তেমনি আমাদের বৃদ্ধ বাবা-মায়েরা পাবেন তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ আইনি ও সামাজিক সুরক্ষা!