08/08/2026
২০২৬-২০২৭ করবর্ষে ব্যবসাবান্ধব কর আইন ও রাজস্ববান্ধব পরিবেশ নিশ্চিতকরণে ৬টি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা:
একজন ট্যাক্স প্রফেশনাল / লয়ার হিসেবে প্রতিদিনের আয়কর সংক্রান্ত কাজ করতে গিয়ে আমরা লক্ষ্য করছি যে, হঠাৎ করে আয়কর আইনে কিছু বড় ধরনের পরিবর্তনের ফলে মাঠপর্যায়ে সাধারণ করদাতা ও ব্যবসায়ীরা চরম বিভ্রান্তি ও সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন।
আমাদের রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য ট্যাক্স বা রাজস্ব অত্যন্ত প্রয়োজন—এ বিষয়ে কোনো দ্বিধা নেই। কিন্তু কর আদায়ের প্রক্রিয়া এমন হওয়া উচিত যাতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ বা বিমুখ না হয়, বরং সচল থাকে। আইন যদি করদাতার জন্য নির্ভরযোগ্য ও ন্যায়সংগত হয়, তবে মানুষ নিজ থেকেই ট্যাক্স দিতে উদ্বুদ্ধ হবে।
জাতীয় স্বার্থে ও করদাতাদের সুরক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের (অর্থ মন্ত্রণালয় ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) দৃষ্টি আকর্ষণ করে নিম্নে ৬টি জরুরি পরিবর্তনের প্রস্তাব উপস্থাপন করছি:
🔹 ১. ব্যক্তি পর্যায়ে সব ধরনের ব্যবসায় ১% টার্নওভার ট্যাক্স রহিত করা:
ব্যবসায়িক লোকসান সত্ত্বেও ১% ন্যূনতম কর আদায়ের নিয়ম ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (SME) মূলধন ধ্বংস করছে। প্রকৃত আয়ের ওপর কর ধার্যের মৌলিক নীতি বজায় রেখে এই বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা জরুরি।
🔹 ২. সঞ্চয়পত্রের উৎসে করকে চূড়ান্ত করদায় (Final Tax) বহাল রাখা:
পেনশনভোগী, বয়স্ক ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের মূল অবলম্বন সঞ্চয়পত্র। উৎসে কেটে নেওয়া করকে চূড়ান্ত করদায় হিসেবে বহাল না রাখলে সাধারণ করদাতারা জটিলতা ও অতিরিক্ত করের বোঝা অনুভব করছেন।
🔹 ৩. সম্পত্তি হস্তান্তরে ১৫% কর রহিত করে পূর্বের চূড়ান্ত করদায় বহাল করা:
সম্পত্তি হস্তান্তরে ১৫% কর আরোপ এবং প্লট ও ফ্ল্যাট মালিকদের ওপর অতিরিক্ত ১৫% ট্যাক্স যুক্ত করার ফলে আবাসন খাতে চরম মন্দা দেখা দিয়েছে। জমি ও ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় অনানুষ্ঠানিক বা অপ্রদর্শিত অর্থ লেনদেনের প্রবণতা বাড়ছে। এটি রহিত করে পূর্বের ন্যায় চূড়ান্ত করদায় হিসেবে গণ্য করা আবশ্যক।
🔹 ৪. আপীল আবেদন পর্যায়ে ১% কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা (ধারা ২৮৫):
ধারা ২৮৫ অনুযায়ী আইনি প্রতিকার বা আপীল করার শুরুতেই বাধ্যতামূলক ১% কর জমা দেওয়ার শর্ত করদাতার ন্যায়বিচার পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকারকে সীমিত করে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতার স্বার্থে এটি বাতিল হওয়া প্রয়োজন।
🔹 ৫. ফার্মের (Firm) কর হার ব্যক্তি শ্রেণীর স্লাব অনুযায়ী নির্ধারণ করা (দ্বিতীয় তফসিল):
অংশীদারি কারবারের (Firm) ওপর সরাসরি ২৭.৫০% কর আরোপ মূলত কর্পোরেট হারের সমতুল্য, যা ছোট ও মাঝারি যৌথ ব্যবসার বিকাশ রুদ্ধ করছে। দ্বিতীয় তফসিল সংশোধন করে ফার্মের আয়কে ব্যক্তি শ্রেণীর ট্যাক্স স্লাব (Tax Slabs) অনুযায়ী করায়ন করা উচিত।
🔹 ৬. অটোমেটেড ও দ্রুত রিফান্ড (Tax Refund) নিশ্চিত করা:
করদাতারা যদি অতিরিক্ত ট্যাক্স দিয়ে থাকেন, তবে তা ফেরত পাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও অটোমেটেড হওয়া উচিত। রিফান্ড পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকলে করদাতারা সততার সাথে সঠিক আয় প্রদর্শন করতে উৎসাহিত হবেন।
রাজস্ব তখনই সঠিক উপায়ে ও প্রবৃদ্ধির সাথে বৃদ্ধি পাবে, যখন কর আইন হবে সহজ, ব্যবসাবান্ধব ও নির্ভরযোগ্য। উপরোক্ত পরিবর্তনগুলো বাস্তবায়িত হলে একদিকে ব্যবসা যেমন গতিশীল হবে, অন্যদিকে রাষ্ট্রের রাজস্ব আদায়ের পরিধিও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
সম্মানিত করদাতা, ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট শুভানুধ্যায়ীদের পোস্টটি শেয়ার করে নীতিনির্ধারকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অনুরোধ করছি।