10/12/2025
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে ডাকসুর সেমিনারে গুম–খুন বন্ধ, জবাবদিহিতা ও জাতীয় ঐক্যের দাবি
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে আজ বুধবার (১০ ডিসেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর সি মজুমদার অডিটোরিয়ামে ডাকসুর উদ্যোগে সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে৷
সেমিনারে বক্তারা মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম–খুন, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতা, ইতিবাচক ছাত্ররাজনীতি, সুশাসন এবং নতুন বাংলাদেশের মানবাধিকার কাঠামো নিয়ে আলোচনা করেন।
ডাকসুর ভিপি সাদিক কায়েম এর সভাপতিত্বে এবং ডাকসুর আইন ও মানবাধিকার সম্পাদক সাখাওয়াত জাকারিয়া ও কার্যনির্বাহী সদস্য শাহীনুর রহমান এর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা বক্তব্য রাখেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তরের মিশনপ্রধান (ভারপ্রাপ্ত) হুমা খান বলেন, মানবাধিকার কোনো কঠিন বা জটিল বিষয় নয়। এটি খুব সহজভাবে বলা যায়- মানুষ হিসেবে সবাই সমান অধিকার পাবে, তাদের ধর্ম, বর্ণ, জাতি, লিঙ্গ, রঙ বা শ্রেণি যাই হোক না কেন।
তিনি বলেন, মানবাধিকার আমাদের জন্য কোনো বিদেশি ধারণা নয়; আমাদের নিজস্ব ধর্মীয় গ্রন্থ এবং বিভিন্ন সংস্কৃতিতেই মানবাধিকারের মূলনীতি-সমতা, ন্যায়বিচার, সহানুভূতি ও সম্মান- স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। সুতরাং এটি আমাদের নিজেদের মূল্যবোধেরই বিস্তার।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে পুলিশ, সিভিল সার্ভিস ও প্রশাসনিক কাঠামো জনগণের সেবায় নিয়োজিত হওয়ার কথা, কারণ জনগণের ট্যাক্সের অর্থেই তাদের বেতন চলে। কিন্তু ঔপনিবেশিক আমলে প্রতিষ্ঠিত মানস অনুযায়ী তারা জনগনকে 'নিয়ন্ত্রণ করা'কেই তাদের কাজ বলে গণ্য করেন৷ একই সাথে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও জনগণের সেবক; শাসক নন। আমাদের মনে এই মানসিক পরিবর্তন আনতে হবে, এবং তরুণ প্রজন্মই এ পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারে।
হুমা খান বলেন, আজ আমরা যে পরিবর্তনের কথা বলছি, গত বছর বাংলাদেশের জনগণ তার ভিত্তি স্থাপন করেছে। বিশ্বজুড়ে অনেক দেশ চেষ্টা করে- কিন্তু সফল হয় খুব কম। বাংলাদেশ সেই সফল দেশের তালিকায় এসেছে-এজন্য আপনাদের অভিনন্দন।
তিনি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের প্রতি গভীর প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, আপনারা একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ে তুলবেন, যা ন্যায়বিচার, সমতা ও পারস্পরিক সম্মান—এই তিন মূলনীতির ওপর দাঁড়াবে।
জাতীয় গুম কমিশনের সদস্য নূর খান লিটন বলেন,
ডাকসুর মাধ্যমে প্রথমবার অফিসিয়ালি মানবাধিকার দিবস পালন করা হচ্ছে, এটি একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। তিনি ছাত্রদের স্মরণ করিয়ে দেন- পূর্বে ছাত্র সংগঠনগুলোর নির্যাতনের ফলে ছাত্রদের মৃত্যু পর্যন্ত হয়েছে; এসব ঘটনা পরিবর্তন করাই ডাকসুর দায়িত্ব।
তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মোকাদ্দাসসহ বহু মানুষ র্যাবের হাতে তুলে নেওয়ার পর নিখোঁজ হয়েছেন। গুমের ঘটনা ভুলে গেলে চলবে না।
গুম কমিশন প্রতিটি ঘটনার সত্য উদঘাটনে কাজ করছে জানিয়ে নূর খান লিটন আহ্বান জানান গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে সহনশীলতা ও বিরোধী মতের প্রতি সম্মানের পরিবেশ বজায় রাখতে।
বেগম রোকেয়া পদকপ্রাপ্ত মানবাধিকার কর্মী এবং জাতীয় গুম কমিশনের সদস্য ড. নাবিলা ইদ্রীস গুমের ভুক্তভোগীদের মানসিক-শারীরিক নির্যাতনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
নাবিলা বলেন, শিক্ষার ক্ষমতা হরণের উদ্দেশ্যে অনেককে ইলেকট্রিক শক পর্যন্ত দেওয়া হয়েছে—ফলে তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তিনি ছাত্ররাজনীতি সংশ্লিষ্ট টর্চার ও গেস্টরুম সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও কথা বলেন এবং প্রতিটি ঘটনা নথিবদ্ধ করার পরামর্শ দেন। এসকল কাজে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়ে ড. নাবিলা বলেন, পরিবর্তনের পথে নারীদের উপস্থিতি অপরিহার্য।
গুমের শিকার ব্যারিস্টার মীর আহমাদ বিন কাশেম (আরমান) বলেন, শত শত পরিবার এখনো জানে না তাদের প্রিয়জন জীবিত না মৃত—রাষ্ট্র তাদের জবাব দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি গুমের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পুনর্বাসনকে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে উল্লেখ করেন। গুমের ঘটনায় অভিযুক্ত শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের দেশত্যাগের ঘটনায় তদন্ত না হওয়াকে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টার প্রতি তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানান ব্যারিস্টার আরমান।
ডাকসু জিএস এস এম ফরহাদ বলেন, শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং ব্যক্তি পর্যায় থেকে অন্যের অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার গ্রহণ করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, “একজন মানুষকে হত্যা করা মানে পুরো মানবজাতিকে হত্যা করা”- এই নীতি অনুসরণ করলেই মানবাধিকার সুরক্ষা অর্থবহ হবে।
সভাপতির বক্তব্যে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম আজাদী আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, ৯০-এর আন্দোলন, ফ্যাসিবাদ বিরোধী দীর্ঘ লড়াই এবং জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান।
তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ছাত্রলীগের মাধ্যমে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে পরিণত করা হয়েছিল। ইসলাম চর্চা বা নামাজ পড়ার অভিযোগে বহু শিক্ষার্থীকে শিবির সন্দেহে নির্যাতন করে উল্লাস পর্যন্ত করা হয়েছে।
সাদিক কায়েম বলেন, যারা মানবাধিকার কর্মীর পরিচয়ে গুম-খুন এবং দমননীতিকে বৈধতা দিয়েছিলেন, তারা জাতির শত্রু -তাদের বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, নতুন বাংলাদেশ হবে সকল মানুষের অধিকার ও ইনসাফের দেশ, যেখানে গুম-খুন কিংবা নির্যাতন থাকবে না।