18/12/2025
"জামিন নিয়ে পলাতক হলেই ‘খুনি’ নয়: উচ্চ আদালতের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত ও ফৌজদারি বিচারিক বিশ্লেষণ"
বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় একটি সাধারণ ধারণা প্রচলিত আছে যে,
"পাপী মন সব সময় পুলিশ দেখে ভয় পায়" বা কোনো আসামি যদি জামিন নিয়ে পলাতক হয়, তবে ধরে নেওয়া হয় যে সে অপরাধটি করেছে বলেই আদালতের মুখোমুখি হতে ভয় পাচ্ছে।
কিন্তু আইন কি কেবল এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে কাউকে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার মতো গুরুতর অপরাধে (খুন) সর্বোচ্চ সাজা দিতে পারে?
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ #বাবুল ওরফে ফখরুল বনাম রাষ্ট্র (ফৌজদারি), ১৫ এএলআর (২০১৯)(১) এডি ১৫৮-১৬১ মামলায় যে সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন, তা ফৌজদারি ন্যায়বিচারের ইতিহাসে একটি মাইলফলক এবং আইনের শাসনের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এই রায়ের মূল প্রতিপাদ্য হলো—শুধুমাত্র জামিন নিয়ে পলাতক থাকার কারণে কোনো আসামির বিরুদ্ধে অন্য কোনো প্রত্যক্ষ বা পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যপ্রমাণ ছাড়া তাকে ৩০২ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা যাবে না।
একজন ফৌজদারি আইনজীবী হিসেবে এই রায়টিকে আমি বাংলাদেশের প্রচলিত আইন ও ফৌজদারি কার্যবিধির আলোকে বিশ্লেষণ করতে চাই। আইনের দৃষ্টিতে ‘পলাতক’ থাকা এবং সাক্ষ্য আইন আমাদের সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২-এর ধারা ৮ অনুযায়ী, কোনো অপরাধ সংঘটনের পর আসামির আচরণ (যেমন—পালিয়ে যাওয়া, আত্মগোপন করা) একটি প্রাসঙ্গিক ঘটনা (Relevant Fact)। প্রসিকিউশন প্রায়শই আসামির পলাতক থাকাকে তার অপরাধী মনের (Mens Rea) বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করে। কিন্তু প্রাসঙ্গিক ঘটনা এবং অপরাধ প্রমাণের জন্য পর্যাপ্ত সাক্ষ্য—এই দুটির মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে। ফৌজদারি বিচারের মূল ভিত্তি হলো "Presumption of Innocence" বা যতক্ষণ পর্যন্ত দোষ প্রমাণিত না হচ্ছে, ততক্ষণ আসামিকে নির্দোষ গণ্য করা। এবং এই দোষ প্রমাণের বোঝা (Burden of Proof) সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্রপক্ষের ওপর ন্যস্ত থাকে, যা তাদের "যুক্তিসঙ্গত সন্দেহের ঊর্ধ্বে" (Beyond Reasonable Doubt) প্রমাণ করতে হয়।
আপিল বিভাগের পর্যবেক্ষণের সারমর্ম
আলোচ্য মামলায় আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন যে, পলাতক থাকা আসামির আচরণের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু এটি কখনোই অপরাধের স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রমাণ (Substantive Evidence) নয়।
কেন এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ?
১. পলাতক থাকার ভিন্ন কারণ: একজন ব্যক্তি কেবল অপরাধী বলেই পলাতক হয় না। সে পুলিশের হয়রানির ভয়ে, মিথ্যা মামলায় ফেঁসে যাওয়ার আশঙ্কায়, মামলা পরিচালনার আর্থিক সামর্থ্য না থাকায়, অথবা ভুল আইনি পরামর্শেও পলাতক হতে পারে। তাই কেবল পলাতক থাকার ওপর ভিত্তি করে খুনের মতো গুরুতর অপরাধের দায় চাপানো ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
২. প্রসিকিউশনের দায়িত্ব: এই রায় প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষকে তাদের মূল দায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তাদের দায়িত্ব হলো আসামি খুনটি করেছে কিনা তা প্রত্যক্ষদর্শী, ফরেনসিক রিপোর্ট বা শক্তিশালী পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্য দিয়ে প্রমাণ করা। তারা মূল অপরাধ প্রমাণ না করে কেবল আসামির জামিন পরবর্তী আচরণের ওপর নির্ভর করে মামলা জিততে পারে না।
৩. সাক্ষ্যের কররোবরেশন (Corroboration): পলাতক থাকার বিষয়টি তখনই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যখন অপরাধের অন্যান্য শক্তিশালী প্রমাণ আদালতে বিদ্যমান থাকে। তখন পলাতক থাকার ঘটনাটি সেই প্রমাণগুলোকে আরও জোরালো করে (Corroborate)। কিন্তু যেখানে মূল অপরাধের অন্য কোনো ভিত্তি নেই, সেখানে পলাতক থাকা একটি শূন্যগর্ভ যুক্তি মাত্র।
উপসংহার:
দণ্ডবিধির ৩০২ ধারার অভিযোগ প্রমাণিত হলে আসামির মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। এমন একটি মামলায় যেখানে মানুষের জীবন-মরণের প্রশ্ন জড়িত, সেখানে কেবল অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত বিপজ্জনক।
আপিল বিভাগের এই রায়টি নিম্ন আদালতগুলোর জন্য একটি স্পষ্ট নির্দেশিকা। বিচারকদের এখন থেকে আরও সতর্ক থাকতে হবে যে, আসামির অনুপস্থিতি যেন তার বিরুদ্ধে একমাত্র সাক্ষ্য হিসেবে গণ্য না হয়। অন্যদিকে, তদন্তকারী কর্মকর্তাদের জন্যও এটি একটি বার্তা—মামলা প্রমাণের জন্য তাদের আরও বস্তুনিষ্ঠ সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের দিকে মনোযোগ দিতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, এই রায় ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং আসামির ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে আরও সুসংহত করেছে। আবেগ বা ধারণার বশবর্তী হয়ে নয়, বরং ठोस সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতেই কেবল কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা উচিত—এটাই আইনের শাসন।