11/10/2025
ক্যাংগারু কোর্ট: ন্যায়বিচারের প্রতি এক নীরব হুমকি
— ব্যারিস্টার নূর উস সাদিক চৌধুরী
“ক্যাংগারু কোর্ট” শব্দগুচ্ছটি প্রথম ব্যবহৃত হয় উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে, অনিয়মিত ও অন্যায্য বিচারের প্রতীক হিসেবে। এটি বোঝায় এমন এক আদালত, যেখানে আইনের নিয়ম, প্রমাণ ও যুক্তি উপেক্ষা করে পূর্বনির্ধারিত রায় দেওয়া হয়। আজকের দিনে এই শব্দটি ব্যবহার হয় যখন কোনো রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী বিচারব্যবস্থাকে তাদের ইচ্ছার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে।
একটি রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারব্যবস্থা টিকে থাকে Rule of Law বা আইনের শাসনের ওপর। কিন্তু ক্যাংগারু কোর্টে এই নীতি সম্পূর্ণ ভঙ্গ হয়। বিচার প্রক্রিয়ায় নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে থাকে ভয়, প্রভাব ও প্রতিহিংসা। এর ফলে নাগরিকরা আদালতের উপর আস্থা হারায়, যা রাষ্ট্রীয় শৃঙ্খলা ও ন্যায়বিচারের ভিত্তি নড়বড়ে করে।
যে দেশে ক্যাংগারু কোর্টের জন্ম হয়, সেখানে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়। আদালত হয়ে ওঠে রাজনৈতিক শক্তির উপকরণ। বিচারকরা স্বাভাবিক বিচারিক স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলেন, আর আইনজীবীরা আত্মরক্ষার প্রবণতায় নীরব হয়ে পড়েন। এতে “Justice must not only be done, but must also be seen to be done” — এই নীতিটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়।
ক্যাংগারু কোর্টে অভিযুক্ত ব্যক্তি সাধারণত আইনজীবীর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হন, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ পান না, প্রমাণ বিকৃত বা গোপন করা হয়। ফলে এটি ন্যায্য বিচারের অধিকার (Right to Fair Trial) ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতি—দুটিকেই পদদলিত করে।
স্বৈরশাসকরা প্রায়ই ক্যাংগারু কোর্ট ব্যবহার করে বিরোধী দল, সাংবাদিক বা মতপ্রকাশকারী নাগরিকদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করে। এতে আদালতের রায় আর ন্যায়বিচার নয়, বরং ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক কৌশলে পরিণত হয়। এর ফলে বিচারব্যবস্থা জনগণের আস্থা হারায় এবং গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।
যেখানে ন্যায়বিচার প্রহসনে পরিণত হয়, সেখানে সমাজে অবিশ্বাস, ক্ষোভ ও আইন অবমাননার সংস্কৃতি জন্ম নেয়। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এমন পরিবেশে আস্থা হারায়, আর আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে রাষ্ট্রটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয়।
ক্যাংগারু কোর্ট একটি দেশের জন্য কেবল আইনি নয়, নৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও গভীর হুমকি। এটি ধীরে ধীরে একটি রাষ্ট্রকে Rule of Law থেকে Rule by Fear-এর দিকে ঠেলে দেয়। ন্যায়বিচারের ভিত্তি রক্ষাই তাই রাষ্ট্র ও সমাজের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হওয়া উচিত— কারণ যেখানে সত্যিকারের বিচার নেই, সেখানে স্বাধীনতাও টেকে না।