25/09/2026
আজ থেকে বছর তিনেক আগে একদিন অফিসে বসে বসে একটা রায় লিখছি। এমন সময় তখনকার বিচার মন্ত্রনালয়ের শীর্ষ এক কর্মকর্তার ফোন আসলো। তিনি বললেন, "তুমি নাকি রাজনৈতিক (পড়ুন বিষ্ফোরক আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন ইত্যাদি) মামলায় জামিন দিচ্ছো এটা আর দিতে পারবানা।" আমি বিনয়ের সাথে বললাম রাজনৈতিক মামলা নামে আলাদা কোনো মামলা আছে নাকি? তিনি ধমকের সুরে বললেন, "আমি কি বলতে চেয়েছি তুমি বুঝেছো। আমি বললাম স্যার, আপনি বিশেষ ক্ষমতা আইন, বিষ্ফোরক আইন এসবের কথা বলছেন? তিনি বললেন, হ্যাঁ। তারপর আবার প্রশ্ন করলাম স্যার, আপনি কি বলতে চেয়েছেন আমি লিগ্যালি ইনক্যাপাবল অর্থাৎ আমার এখতিয়ার বহির্ভূত কারণে আমি জামিন দিতে পারবোনা? তিনি রাগান্বিত হয়ে বললেন, না এটা বলিনি। তোমার এখতিয়ার আছে তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিতে হবে। উনার বেআইনী ও অসাংবিধানিক আলাপচারিতায় আমারও ভেতর থেকে রাগ হচ্ছে। কিন্তু তিনি তো নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের একজন। নিজের রাগ নিয়ন্ত্রণ করে সংবিধানের ১১৬ক অনুচ্ছেদের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বললাম, সংবিধান অনুযায়ী প্রত্যেক ম্যাজিস্ট্রেট এবং বিচারক বিচারিক কাজে সম্পূর্ণ স্বাধীন। তিনি ক্রোধে ফেটে পড়ে ফোন রেখে দিলেন। বাস্তবতা হলো, তৎকালীন বিরোধী দলের (বর্তমান ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল) নেতাকর্মীদের নামে নির্বিচারে 'গায়েবী মামলা' দিয়ে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হচ্ছিলো। আমার বিচারিক মন বলছিলো এইসবগুলো মানুষ নিরপরাধ। এমনকি ওই জেলার এসপি সংবাদ সম্মেলন করে বলেছিলেন এই জেলায় নাশকতার কোনো ঘটনা ঘটেনি। তখন এক সাংবাদিক প্রশ্ন করেছিলেন তাহলে নাশকতার এতগুলো মামলা দায়ের হলো কেনো? তিনি উত্তর দিতে পারেননি। এই মামলাগুলোর বেশ কয়েকটাতে সম্পূর্ণ মেরিট বিবেচনায় জামিন দিয়েছি। সেদিনও বেশ কিছু আসামীর জামিন শুনানি আছে। সকালে এজলাসে ওঠার আগে আগে এমনভাবে শাসানো হলো। স্থানীয় কর্তৃপক্ষও একই সুরে কথা বললেন। সহকর্মীদের মধ্যেও অনেকেই বললেন বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে জামিন না দেয়াই ভালো হবে। চেম্বারে বসে বসে চিন্তা করছি। এরই মধ্যে এজলাসে ওঠার সময় হয়ে গেলো। ওজু করে দু'রাকাত নামাজ পড়লাম। গভীরভাবে চিন্তা করলাম যদি জামিন দেই তাহলে কে খুশি হবেন আর যদি না দেই তাহলে কে খুশি হবেন? আমার হৃদয় থেকে উত্তর আসলো যে এই নিরপরাধ মানুষদের যদি জামিন দেই তাহলে আসমান জমিনের যিনি সর্বময় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের মালিক তিনি খুশি হবেন। আর জামিন না দিলে আমার কর্তৃপক্ষ খুশি হবেন। চোখ বন্ধ করে সিদ্ধান্ত নিলাম আজ যদি বিচার বিভাগে আমার শেষ কর্মদিবসও হয় তাহলে সেটাই হোক। আসমান ও জমিনের মালিক আমার জন্য যা নির্ধারিত করে রেখেছেন তাই হবে। একদম ঠান্ডা মাথায় এজলাসে উঠে ওই নিরপরাধ মানুষদের জামিন মঞ্জুর করলাম। অন্যান্য মামলাও স্বাভাবিকভাবে শেষ করে এজলাস থেকে নামলাম। ভেতর থেকে এক অসাধারণ প্রশান্তির অনুভূতি হচ্ছিলো। এর কিছু দিন পরে জানতে পারলাম অনেক দূরের একটি জেলায় আমার বদলীর প্রস্তাব পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেউ কেউ পরামর্শ দিলেন আমি যেনো সুপ্রীমকোর্টে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের নিকট অনুরোধ করি যাতে আমাকে বদলী না করা হয়৷ আমি উনাদের বললাম সমগ্র বাংলাদেশ আমার জন্য একইরকম। আর আমার রিজিক যেখানে নির্ধারিত হয়েছে সেখানে আমি খুবই কৃতজ্ঞ চিত্তে যাবো। আল্লাহর শুকরিয়া ওই দূরবর্তী কর্মস্থল আমার জন্য এতটাই তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছিলো তা বর্ণনাতীত৷ অনেকের বিবেচনায় সেটা পানিশমেন্ট পোস্টিং হলেও আমার বিবেচনায় ওটা ছিলো এক অসাধারণ অধ্যায়। এভাবেই চলছে আমার মতো নগণ্য এক বিচারকের বিচারিক জীবন। বিচারিক জীবনের প্রথম দিন থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ন্যায়ের প্রশ্নে কখনোই মাথা নোয়াবোনা। আল্লাহর শুকরিয়া যে এই দীর্ঘ পথচলায় এখনো মাথা নোয়াতে হয়নি। নিজের অজ্ঞতাবশত অবিচার করে থাকলে সবসময় ক্ষমা চাই। কিন্তু জ্ঞানত কখনোই ন্যায়ের বিপরীতে অবস্থান গ্রহণ করিনি। সেই মহান সত্ত্বার নিকট সবসময় যে প্রার্থনা করি তা হলো, ন্যায্যতার পথ বেয়ে যেনো জীবন সায়াহ্নে পৌঁছাতে পারি।