05/04/2026
“ল’ পড়ছো? আচ্ছা… টাউট হবা না তো?”
ওকালতি পড়ছো মানেই টাউট—এই জনপ্রিয় রায়টা আমাদের আদালতপাড়ার উপরে এক অলিখিত ফতোয়া হয়ে গেছে। যেন ‘ল’ পড়া মানেই চরিত্রগতভাবে সন্দেহভাজন এক শ্রেণি। তার উপরে যদি আবার মাদ্রাসাছাপ থাকে তাইলে তো মরার উপরে খাড়ার ঘা!
কিন্তু একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে, এই ইমেজটা হাওয়ায় তৈরি হয়নি। এর পেছনে আছে কিছু দৃশ্যমান বাস্তবতা, কিছু আচরণগত সংকট। এখন এই ইনস্টিটিউশনাল থিয়েটার সিস্টেমটা ব্রিটিশদের বানানো। একে অনেকেই হয়তো বলবেন colonial hangover, কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এই ফ্রেমওয়ার্কের ভেতরেই আপনাকে খেলতে হবে।
তাই আমার কিছু অবজার্ভেশন দেই:
১. প্রথম কথা, ল’ স্টুডেন্ট বা জুনিয়র হিসেবে নিজের উপস্থিতি (presentation) নিছক বাহ্যিক বিষয় না, বরং পেশাগত ভাষা। আপনি যদি জিন্সের উপর কোর্ট, স্যান্ডেল পরে হাজির হন, তাহলে আপনি অজান্তেই নিজেকে সেই ‘টাউট সাবকালচার’-এর পাশে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছেন। আদালতপাড়া খুব সূক্ষ্ম জায়গা কেননা এখানে perception-ই currency। এখানে কেবল আইন জানলেই হয় না, আপনাকে সেই আইনের ভাষা, ভঙ্গি, রীতিনীতিও ধারণ করতে হয়। খুব গরমের মধ্যেও স্যুটেড-বুটেড থাকার অভ্যাস করতে হবে। সিংগেল ব্রেস্টেড কোটে কয়টা বোতাম লাগাতে হয়, অক্সফোর্ড শু কীভাবে লেস বাধতে হয়, টাই-য়ের উইন্ডসর নট কীভাবে বাধতে হয়, ইত্যাদি যত ড্রেস এটিকেট আছে সব শিখতে হবে। নয়তো পোশাক, বাচন ভঙ্গি, কথা বার্তায় ক্ষ্যাত হলে জজ, অপনেন্ট এবং ক্লায়েন্ট সবাই ক্ষ্যাত হিসেবেই গণ্য করবে।
২. দ্বিতীয় কথা, ভাষা। ইংরেজি বর্তমানে শুধু ভাষা না, এটা একটা social filter। বাংলাতে আপনি চাইলে জেলা বারে সম্মান নিয়ে প্র্যাকটিস করতে পারবেন, কিন্তু কর্পোরেট ফার্ম, মাল্টিন্যাশনাল ক্লায়েন্ট, ফরেন কনসালটেন্সি এসব জায়গায় ঢুকতে গেলে চোস্ত ইংরেজিই আপনার পাসপোর্ট। এখন এটা ভালো না খারাপ তা আলাদা বিতর্ক। কিন্তু এটা আছে—এটাই fact।
৩. তৃতীয়ত, আচরণ তথা demeanour।
দেখুন, একজন আইনজীবীর দুইটা মুখ থাকে। একটা মজলুমের সামনে: যেখানে আপনাকে নরম, সহানুভূতিশীল হতে হবে। সেখানে আপনার আচরণ হবে দাঈ'র মত ধৈর্যশীল, আশ্বাসদায়ী।
আরেকটা অপরাধীর সামনে: যেখানে আপনাকে দৃঢ়, কঠোর হতে হবে। এদের সাথে ড্যাম কেয়ার অ্যাটিটিউট না দেখালে এদের সাথে পেরে উঠবেন না।
এই দ্বৈততা না শিখলে আপনি প্র্যাকটিসে টিকতে পারবেন না।
৪. চতুর্থত, মানুষ চেনার ক্ষমতা। যেটাকে আরবিতে বলে 'ফিরাসা'।
ক্লায়েন্টের কথা, চোখ, দেহভঙ্গি এসব থেকে বুঝতে শিখতে হবে কে কেমন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসছে। কে জেনুইন লোক, আর কে ধান্ধাবাজ।
এই স্কিল বই পড়ে আসে না, আসে exposure থেকে। তাই ছাত্রজীবনে নিজেকে কোনো এক শ্রেণিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ক্লাসের সবচাইতে নার্ড এবং ভদ্র ছেলে-মেয়ে থেকে শুরু করে সবচাইতে ইতর ছেলে-মেয়ের সাথে চলা ফেরা করবেন কোন বাছ বিচার ছাড়াই। কারণ ওকালতি করতে গেলে আপনাকে ভদ্রলোকের ড্রইংরুম আর রাস্তার চায়ের দোকান দুই জায়গাতেই বসতে হবে। তখন কে ভদ্রলোক আর কে টাউট তা বুঝে উঠতে পারবেন না যদি না আগে থেকে মিশে থাকেন।
৫. পঞ্চমত, নেটওয়ার্কিং যাকে আধুনিক ভাষায় বলে social capital।
রাজনীতি, সোশ্যাল ওয়ার্ক, খেলাধুলা এসব জায়গায় উপস্থিতি মানে নিজের visibility বাড়ানো। আইন অঙ্গনের বাইরেও সকল ডিসিপ্লিনের মানুষের সাথে মিশে তাদের জ্ঞান, চিন্তা আহরণ শুরু করবেন। A good lawyer knows something about everything and everything about something.
উপরন্তু, বাংলাদেশের বাস্তবতায় পলিটিক্যাল ট্যাগ একধরনের সিগন্যাল। আপনি এক্টিভ হন বা না হন, আপনার পেছনে ট্যাগ লেগে যাবেই। তাই, আপনাকেই বেছে নিতে হবে কোন ট্যাগটি আপনি লাগাতে দিচ্ছেন।
৬. ষষ্ঠত, ইথিক্স।
শিক্ষানবীশ অবস্থায় ক্লায়েন্টের কাছ থেকে চা-নাস্তার বিল কিংবা ১/২ শত টাকা নেওয়া যাবেনা। এইগুলো খুব ছোট মনে হলেও এগুলোই কিন্তু আপনার ‘ছোটোলোকী’ ইমেজ গড়ে।
আপনি যদি শুরুতেই নিজেকে ‘ছোট সুবিধা নেওয়া মানুষ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, তাহলে বড় ক্লায়েন্ট কখনো আপনাকে সিরিয়াসলি নেবে না।
আইন পেশায় trust ধীরে তৈরি হয়, কিন্তু একবার ভাঙলে আর ফেরে না। তাই যেই ক্লায়েন্টকে আপনি ধরে রাখতে চান তার সাথে ছোটোলোকী চলবে না। তারচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, আদালতে নিজেকে ম্যালপ্রাক্টিস করনেওয়ালা উকিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যাবেনা।
আপনি যদি শুরুতে এই স্ট্রাগলগুলো করে নিজের ক্লিন ইমেজ গড়ে তুলতে পারেন, বেশি না ৫ বছর পরে আদালতের নাজির থেকে জজ, সবাই জেনে যাবে যে আপনি সলিড লোক। আপনি কোর্টে দাড়ালে জজ এবং অপোনেন্ট লইয়ার দুজনেই আপনাকে সমীহ করবে। তখন ফি-এর জন্য ক্লায়েন্টের সাথে গুলিস্তান ফুটপাথের জুতার দামের মুলোমুলি করতে হবেনা।
#আইন #আদালত