23/06/2026
বিয়ের দিন কাজি সাহেব একে একে কলামগুলো পূরণ করেন। মোহরানা কত, দেনমোহর কীভাবে পরিশোধ হবে, বহুবিবাহের অনুমতি আছে কিনা—এসবের পাশাপাশি একটি কলাম থাকে যা অনেক বিয়েতেই নিঃশব্দে ফাঁকা রয়ে যায়। সেটি ১৮ নম্বর কলাম, যেখানে লেখা থাকে—স্বামী কি স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করেছেন কিনা।
বাংলাদেশে কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামটি মূলত স্বামীর পক্ষ থেকে স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ (তালাক-ই-তাফউইজ) সংক্রান্ত। এই কলামটি ফাঁকা থাকলে অনেকে ধরে নেন, স্ত্রীর পথ চিরতরে বন্ধ। কিন্তু এই ধারণাটি আইনগতভাবে সম্পূর্ণ ভুল।
১৮ নম্বর কলাম আসলে কী বলে, কী বলে না?
১৮ নম্বর কলামটি কেবল একটি বিষয়ই নির্ধারণ করে—স্বামী তার স্ত্রীকে একতরফাভাবে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা অর্পণ করেছেন কিনা। এটি ফাঁকা থাকার অর্থ শুধু এটুকুই যে স্ত্রী স্বয়ংক্রিয়ভাবে unilateral বা একতরফা তালাক দিতে পারবেন না।
কিন্তু, মুসলিম আইনে বিবাহ বিচ্ছেদের একাধিক পথ আছে। যেমন—
স্বামীর পক্ষ থেকে তালাক,
স্ত্রীর পক্ষ থেকে তালাক-ই-তাফউইজ ও লিয়ান,
এবং উভয়ের সম্মতিতে খোলা ও মুবারাত।
এর বাইরে ১৯৩৯ সালের আইন সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিচারিক পথ উন্মুক্ত করে রেখেছে।
--------------------
সুতরাং স্ত্রীর সামনে তালাকের জন্য তিনটি পথ খোলা থাকে—
প্রথম পথ: তালাক-ই-তাফউইজ (কাবিন অনুযায়ী)
যদি ১৮ নম্বর কলামে ক্ষমতা দেওয়া থাকে, তাহলে স্ত্রী সেই অর্পিত ক্ষমতা ব্যবহার করে তালাক দিতে পারবেন, তবে নিকাহ রেজিস্ট্রার তালাক-ই-তাফউইজ নিবন্ধন করবেন না যদি না স্বামীর পক্ষ থেকে ক্ষমতা অর্পণের নিবন্ধিত দলিল বা বিবাহ রেজিস্টারে সেই নিবন্ধনের সত্যায়িত কপি উপস্থাপন করা হয়।
দ্বিতীয় পথ: খোলা (Khula)
স্ত্রী স্বামীকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে খোলার মাধ্যমে বিবাহ বিচ্ছেদ করতে পারেন। এমনকি স্বামী সম্মত না হলেও আদালত পারে বিচ্ছেদের আদেশ দিতে, যদি প্রমাণিত হয় যে দুজনের একসাথে বসবাস আর সম্ভব নয়। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, খোলা এবং Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939 অনুযায়ী বিচারিক বিচ্ছেদ দুটো আলাদা ও স্বতন্ত্র অধিকার—আদালত নিজে থেকে একটিকে অন্যটিতে রূপান্তর করতে পারে না। আর গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, যদি স্ত্রী DMMA-র অধীনে বিচারিক বিচ্ছেদ পান, তাহলে ধারা ৫ অনুযায়ী তার দেনমোহরের অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকে, কিন্তু খোলার ক্ষেত্রে তাকে সাধারণত দেনমোহর ছেড়ে দিতে হয়।
তৃতীয় পথ: আদালতের মাধ্যমে বিচারিক বিচ্ছেদ
এখানে স্বামীর সম্মতির কোনো প্রয়োজন নেই। Dissolution of Muslim Marriages Act, 1939-এর ধারা ২ অনুযায়ী, মুসলিম আইনে বিবাহিত একজন স্ত্রী নির্দিষ্ট কারণে আদালতের কাছে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি চাইতে পারেন। এর মধ্যে রয়েছে—
(i) স্বামীর ঠিকানা/অবস্থান ৪ বছর ধরে অজানা থাকলে।
⚠️ বিশেষ শর্ত: এই গ্রাউন্ডে ডিক্রি পাস হলেও তা ৬ মাস পর্যন্ত কার্যকর হবে না। এই সময়ের মধ্যে স্বামী ব্যক্তিগতভাবে বা অনুমোদিত প্রতিনিধির মাধ্যমে হাজির হয়ে দাম্পত্য দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি দেখাতে পারলে আদালত ডিক্রি বাতিল করবে।
--------------------
(ii) স্বামী ২ বছর ধরে স্ত্রীর ভরণপোষণ দিতে অবহেলা করলে বা ব্যর্থ হলে।
--------------------
(iia) স্বামী Muslim Family Laws Ordinance, 1961-এর বিধান লঙ্ঘন করে অতিরিক্ত বিয়ে করলে।
--------------------
(iii) স্বামী ৭ বছর বা তার বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হলে।
⚠️ বিশেষ শর্ত: সাজা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই গ্রাউন্ডে ডিক্রি পাস হবে না।
--------------------
(iv) স্বামী যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়া ৩ বছর ধরে দাম্পত্য দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হলে।
--------------------
(v) স্বামী বিবাহের সময় পুরুষত্বহীন (impotent) ছিলেন এবং এখনো তাই থাকলে।
⚠️ বিশেষ শর্ত: এই গ্রাউন্ডে ডিক্রি পাসের আগে আদালত স্বামীর আবেদনে ১ বছর সময় দেবে সুস্থতা প্রমাণের জন্য। সেই সময়ের মধ্যে প্রমাণ করতে পারলে ডিক্রি হবে না।
--------------------
(vi) স্বামী ২ বছর ধরে পাগল হলে, বা কুষ্ঠরোগ (leprosy), বা মারাত্মক যৌনরোগে (virulent venereal disease) আক্রান্ত হলে।
--------------------
(vii) স্ত্রীকে পিতা বা অভিভাবক ১৮ বছর বয়সের আগে বিয়ে দিয়েছিলেন, এবং স্ত্রী ১৯ বছর হওয়ার আগেই সেই বিবাহ অস্বীকার করেছেন।
⚠️ বিশেষ শর্ত: বিবাহ সম্পন্ন (consummated) হয়নি — এই শর্ত পূরণ হতে হবে।
--------------------
(viii) স্বামী নিষ্ঠুরতার সাথে আচরণ করলে, অর্থাৎ:
(a) অভ্যাসগতভাবে শারীরিক আঘাত করলে বা এমন আচরণ করলে যা শারীরিক নির্যাতন না হলেও স্ত্রীর জীবন দুর্বিষহ করে তোলে।
(b) কুখ্যাত চরিত্রের নারীদের সাথে মেলামেশা করলে বা নিজে কুখ্যাত জীবনযাপন করলে।
(c) স্ত্রীকে অনৈতিক জীবনযাপনে বাধ্য করার চেষ্টা করলে।
(d) স্ত্রীর সম্পত্তি বিক্রি/নষ্ট করলে বা স্ত্রীকে তার সম্পত্তির উপর আইনগত অধিকার প্রয়োগ করতে বাধা দিলে।
(e) স্ত্রীকে তার ধর্মীয় বিশ্বাস বা চর্চায় বাধা দিলে।
(f) একাধিক স্ত্রী থাকলে কোরআনের নির্দেশ অনুযায়ী সমান আচরণ না করলে।
Hosne Ara Begum vs. Alhaj Md. Rezaul Karim (43 DLR 1991 (HCD) 543) মামলায় আদালত বলেছিল, সম্পন্ন পরিবারের একজন স্ত্রীকে গৃহস্থালির কাজ করতে বাধ্য করা, যা তিনি অভ্যস্ত নন, তা নিষ্ঠুরতার সমতুল্য। এই মামলাটি DMMA-র "cruelty" ধারার ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির।
--------------------
(ix) মুসলিম আইনে বৈধ বলে স্বীকৃত অন্য যেকোনো কারণে।
Nur Nabi (Md) vs. Salima Akter Doly (13 BLC (HCD) 327) মামলায় আদালত বলেছেন, Muslim Family Laws Ordinance, 1961-এর ধারা ৭ অনুযায়ী নোটিশ প্রদানের বাধ্যবাধকতা কঠোরভাবে পালন না করলে কোনো তালাক আইনের দৃষ্টিতে বৈধ হবে না। এই নীতি স্বামী ও স্ত্রী উভয় পক্ষের তালাকের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।
--------------------
প্রচলিত দুটো ভুল ধারণা ও তার সঠিক জবাব
ভুল ধারণা ১: "১৮ নম্বর কলাম ফাঁকা মানে স্ত্রী আর কখনো তালাক দিতে পারবেন না।"
সঠিক: এই কলাম ফাঁকা থাকা কেবল একতরফা তালাক-ই-তাফউইজ দেওয়ার ক্ষমতা না থাকার ইঙ্গিত দেয়। স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদের তিনটি পথ—তাফউইজ, খোলা, এবং আদালতের মাধ্যমে বিচ্ছেদ—এর মধ্যে শুধু প্রথমটি বন্ধ থাকে, বাকি দুটো পথ সম্পূর্ণ খোলা থাকে।
ভুল ধারণা ২: "স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্ত্রী আদালতেও যেতে পারবেন না।"
সঠিক: DMMA, 1939-এর অধীনে Family Court-এ মামলা করা স্ত্রীর সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র অধিকার। নির্দিষ্ট কারণ প্রমাণ করতে পারলে আদালত স্বামীর মতামত নির্বিশেষে বিবাহ বিচ্ছেদের ডিক্রি দিতে পারে।
Mrs. Sherin Akhter and another vs. Al-Haj Md. Ismail, 20 BLD (HCD) 159 (2000) মামলায় বৈবাহিক দায়িত্ব ও অধিকারের প্রশ্ন আসলে আদালত স্ত্রীর বিবাহ বিচ্ছেদের আবেদনের অধিকার স্বীকার করেছে।
কাবিননামার একটি ফাঁকা কলাম কোনো নারীর বিচার চাওয়ার দরজা বন্ধ করতে পারে না—এটাই বাংলাদেশের পারিবারিক আইনের মূল কথা।
আইনি অধিকার জানুন, নিজেকে রক্ষা করুন
#তালাক