22/08/2026
টিনেজ বয়সী বাচ্চার সাথে আচরণের ধরন পালটে ফেলুন, বাচ্চা এমনি এমনি সঠিক পথে চলে আসবে:
সন্তান যখন ১০-১২ বছর পেরিয়ে কৈশোরে (Teenage) পা রাখে, তখন তার মানসিক জগতে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। এই বয়সে শাসন বা কড়া নজরদারি, অভিভাবকদের আদেশসূচক আচরণ ইত্যাদি বাচ্চাকে ভুল পথে পরিচালিত করে।
টিনেজ বাচ্চাকে কীভাবে গাইড করা যেতে পারে তার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট নিচে শেয়ার করা হলো:
১. সন্তানের সামনেই বাবার কাছে 'নালিশ' করার অভ্যাস বন্ধ করুন।
অনেক মা সারাদিন বাচ্চার ওপর রাগ জমে থাকার পর, বাবা বাসায় ফেরামাত্র সন্তানের সামনেই শুরু করেন নালিশের পাহাড়: "আজকে তোমার সন্তান এই করেছে, ওটা ভেঙেছে, কথা শোনেনি" ইত্যাদি ইত্যাদি। এসব বন্ধ করুন। যদিও মায়েদের আসল উদ্দেশ্য: বাচ্চাকে মার খাওয়ানো বা কষ্ট দেওয়া নয়, বরং বাবার ভয় দেখিয়ে হলেও সন্তানকে সঠিক পথে আনা।
কিন্তু আপনার এই আচরণে বাচ্চার কাছে যে মেসেজ যায় তা হলো— "মা আমাকে ভালোবাসে না, মা বাবাকে দিয়ে আমাকে অপমান ও মার খাওয়ানোর চেষ্টা করছে!"
ফলাফল: বাচ্চার মনে মায়ের প্রতি দূরত্ব ও ঘৃণা তৈরি হয় এবং সে বাবার সামনে একরকম আর পেছনে অন্যরকম হতে দ্বিমুখী আচরণ শেখে।
আপনি যা করতে পারেন: বাচ্চার ভুলত্রুটি নিয়ে বাবার সাথে আলাদাভাবে কথা বলুন, সন্তানের সামনে তাকে "অপরাধী" বানিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবেন না।
২. আদেশদাতা (Boss) না হয়ে পরামর্শদাতা (Consultant) হন।
ছোটবেলার মতো "এটা করো, ওটা করো না" বলা বন্ধ করুন। টিনেজ বয়সে নির্দেশ দেওয়ার বদলে তাকে বিকল্প অপশন দিন এবং নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দিন।
৩. বকা দেওয়ার বদলে 'এক্টিভ লিসেনিং'
সন্তানের ভুল দেখলে সঙ্গে সঙ্গে রায় না দিয়ে আগে তার কথা পুরোটা শুনুন। সে কী বলতে চায় তা বোঝার চেষ্টা করুন। সে যখন দেখবে আপনি তাকে শুনছেন, সে নিজেই তার ভেতরের বিষয়গুলো প্রকাশ করবে।
৪. বাচ্চার আবেগকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করবেন না।
বন্ধুদের সাথে অমিল, নিজের চেহারা/গায়ের রঙ নিয়ে হীনমন্যতা, তার বন্ধুদের সামনে বা বাসায় গেস্ট আসলে তাদের সামনে বা অন্য কোনো মানুষের সামনে তাকে তুচ্ছ করা, বকা বা ধমক দেওয়া বন্ধ করুন। শাসন করবেন গোপনে। —এগুলো টিনেজারদের কাছে খুব বড় বিষয়। তাদের এই বয়সে নিজের প্রেস্টিজ তৈরি হয়, তাদেরও একটা সমাজ আছে, সেই সমাজে তার ব্যক্তিত্ব নিয়ে চলতে সাহায্য করুন।
"ধুর! এসব ফালতু চিন্তা বাদ দাও" বলে তার আবেগগুলো উড়িয়ে দেবেন না।
৫. গোপনীয়তাকে (Privacy) সম্মান দিন।
তার ডায়েরি, ফোন বা ব্যক্তিগত জিনিসে গোপনে নজরদারি না করে খোলামেলা বিশ্বাসের পরিবেশ তৈরি করুন। যত বেশি সন্দেহ করবেন, সে তত বেশি গোপন করা শিখবে।
৬. অন্যদের সাথে তুলনা বন্ধ করুন।
"অমুকের সন্তান তো কত লক্ষ্মী, অমুক রেজাল্ট ভালো করেছে, তমুক এই কাজ করতে পারে তুমি পারো না"—এই তুলনাগুলো টিনেজারকে জেদী ও বিদ্রোহী বানিয়ে ফেলে। আপনার সন্তানের ভালো দিকগুলোকে হাইলাইট করুন।
৭. আপনি যদি কারো ফোন রিসিভ করে বাসায় থেকে বলেন "আমি তো বাজারে", বা কারো বাসায় বেড়াতে গিয়ে বলেন "আমি তো বাসায়", বা বাচ্চাকে শিখিয়ে দেন "এটা তোমার বাবাকে বোলো না, বা অমুককে বোলো না"—তবে আপনার বাচ্চা মিথ্যা বলাকে স্বাভাবিক মনে করবে, এবং এসব করা শিখে যাবে।
মনে রাখবেন: আপনার বাচ্চা আপনার দেওয়া শিক্ষার চেয়ে আপনাকে দেখে বেশি শেখে। অর্থাৎ, আপনি তাকে কী করতে বলছেন এটা শেখার চেয়ে আপনি নিজে কী করছেন এটা তার কাছে বেশি অর্থপূর্ণ। আপনি বলছেন মিথ্যা বলা পাপ, এবং আপনি নিজেই তার সামনে বাসায় বসে ফোন রিসিভ করে বললেন "আমি তো বাসায় নেই"—এটাই আপনার বাচ্চা শিখবে।
আপনি তাকে টাইমলি পড়তে বসার কথা বলে আপনি নিজেই লেট করে অফিসে গেলেন, এটাই আপনার বাচ্চা শিখবে।
টিনেজ বয়সটা জোর-জবরদস্তির বয়স নয়, আস্থা অর্জনের বয়স। আপনি যখন আপনার আচরণের মোড় ঘোরাবেন এবং সন্তানকে নিরাপত্তার অনুভূতি দেবেন, তখন সে আর আপনাকে শত্রু ভাববে না—বরং নিজের ভুলগুলো শুধরে স্বাভাবিকভাবেই সঠিক পথে ফিরে আসবে।
- শাহিনা আক্তার মিতা
Co-founder & CEO, School of Financial Intelligence
18-08-26