21/08/2024
# শেখ হাসিনা পালিয়ে বাঁচলেন, ধ্বংস করলেন তাঁর পিতাকে।
পৃথিবীতে যত রাজনৈতিক পরিবর্তন হয়েছে, তার একটা সহজ-সরল নাম হচ্ছে বিপ্লব। একসময় কমিউনিস্টরা প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বিপ্লব শব্দটি বলতেন। এখন বিপ্লবের কথা তাঁরা আর বলেন না। সময়ে-সময়ে যে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সেটি হয় সহিংস। পালাবদলের সব সময় দুটি পক্ষ থাকে। একটি বিজয়ী, অপরটি পরাজিত। জয়ী পক্ষ বলে বিপ্লব। পরাজিত পক্ষ বলে ষড়যন্ত্র।
১৯৭৫ সালে দেশে চেপে বসেছিল একদলীয় (বাকশাল) শাসনব্যবস্থা। সরকার পরিবর্তনের কোনো ব্যবস্থা সংবিধানে রাখা ছিল না। সংবিধানে ছিল—কোনো ধরনের পরিবর্তন হলে, সেটি হবে রাষ্ট্রপতির ইচ্ছা অনুযায়ী। ১৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তন হলো হত্যাযজ্ঞের মধ্য দিয়ে। রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবার নিহত হলেন।
শেখ মুজিবের সরকার এমন এক সময়ে উৎখাত হয়েছিল, যখন তাঁর জনপ্রিয়তা তলানিতে নেমে এসেছিল। একসময় শেখ মুজিব জনপ্রিয়তার শীর্ষে ছিলেন। আর সেখানে তিনি পৌঁছেছিলেন ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই। ইতিহাসে এ রকম দৃষ্টান্ত বিরল; কিন্তু কয়েক বছরের ব্যবধানে এমন পরিবর্তন হলো, যেটা অনেকেই ভাবতে পারেননি।
ঠিক একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলো পাঁচ দশক পরে—২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। মোসাহেব ও মৌ-লোভীদের দ্বারা ঘেরা শেখ হাসিনা ভেবেছিলেন দিন এভাবেই যাবে; কিন্তু মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ কী ঘটিয়ে দিতে পারে, সেটা সম্ভবত ২৪ ঘণ্টা আগেও তিনি বুঝতে পারেননি।
পঁচাত্তরে যে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছিল, তার নজির আমাদের এখানকার ইতিহাসে ছিল না। এর আগে পাকিস্তান আমলে যেসব সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে, সেগুলো ছিল রক্তপাতহীন। পঁচাত্তরে হয়েছিল রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থান। যাঁরা এটা ঘটিয়েছিলেন, তাঁরা বলতেন, এটা বিপ্লব। পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ এটিকে বলেছে জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। আমার একটি সরল বিশ্লেষণ হলো—পঁচাত্তরের অভ্যুত্থানটি ঘটিয়েছিল সরকারি দলের বিক্ষুব্ধ একটি অংশ। তাদের সহযাত্রী হয়েছিল সেনাবাহিনীর একটি অংশ।
একাত্তরে শেখ মুজিব ছিলেন জনগণের নেতা। পঁচাত্তরে তিনি ছিলেন শাসক। একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তাঁকে ধরে নিয়ে গিয়ে মানুষের আন্দোলন ও আকাঙ্ক্ষাকে দমাতে চেয়েছিল। তাতে তারা ব্যর্থ হয়েছিল। পঁচাত্তরে ছিল শেখ মুজিবের শাসনের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান। সেই অভ্যুত্থানে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ না থাকলেও সমর্থন ছিল। শাসক দলের বাইরে প্রায় প্রতিটি রাজনৈতিক দল পঁচাত্তরের অভ্যুত্থানকে সমর্থন দিয়েছিল।
সত্তরের দশকের শুরু থেকেই বাংলাদেশে যে এক ব্যক্তির শাসন আমরা দেখে আসছিলাম, ১৯৯১ সালের তথাকথিত গণতান্ত্রিক উত্তরণের মধ্য দিয়েও তার পরিবর্তন হয়নি। আমরা সেই ব্যক্তির শাসনই দেখেছি। পর্যায়ক্রমে খালেদা, হাসিনা, খালেদার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক শাসনের যূপকাষ্ঠে পুরো দেশ বলি হয়েছে। এরপর এক–এগারো অনেক কিছু তছনছ করে দিল। কিন্তু এক–এগারো থেকে রাজনীতিবিদেরা কোনো শিক্ষা নেননি। এক–এগারো পরবর্তী বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস পর্যন্ত একটানা শাসনক্ষমতায় ছিল শেখ হাসিনার সরকার। এই সময়ে তিনটি প্রহসনের নির্বাচন হয়েছে অথবা একতরফা নির্বাচন হয়েছে। তাঁর দল কয়টি আসন পাবে, বিরোধী দল কয়টি আসন পাবে—সবই ঠিক করে দিতেন শেখ হাসিনা। এমন অবস্থা কোথাও আমরা দেখিনি, শুনিনি।
এক ব্যক্তি, তাঁর আত্মীয়স্বজন, জ্ঞাতিগুষ্টি, মোসাহেব ও লাঠিয়াল—তাদের দিয়েই শাসনকাজ পরিচালিত হয়েছে। এর বিরুদ্ধে মানুষ ক্ষুব্ধ হচ্ছিল; কিন্তু তা প্রকাশের ভাষা পাচ্ছিল না। শেখ হাসিনার ক্ষমতায় থাকাটা অনেকটাই নির্ভর করত পুলিশ বাহিনীর ওপরে। কিন্তু সেই রক্ষাব্যূহটা একপর্যায়ে ভেঙে পড়ল। কারণ, তরুণেরা এগিয়ে আসছিল, গুলির সামনে বুক পেতে দিচ্ছিল। তখন শেখ হাসিনা সেনাবাহিনী ডাকলেন। সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নিল, তারা জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না। তাতে করে শেখ হাসিনার স্বপ্নের সৌধ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল।
জনগণের যে ক্ষোভ, সেই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যেভাবে হলো, সেটি শেখ হাসিনা, আওয়ামী সরকার ও তার মোসাহেবদের ছাপিয়ে ধাবিত হলো শেখ মুজিবের ওপরে। শেখ মুজিব এ দেশের মানুষকে ধীরে ধীরে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের তাঁর বাড়িটি, যেটি একটি জাদুঘর হয়েছিল, সেটা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হলো। শেখ হাসিনার প্রতি যে ক্ষোভ, রাগ, অসন্তোষ এবং ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে থাকার জন্য তাঁর যে নানা কলাকৌশল, তার খেসারত দিতে হলো মৃত শেখ মুজিবকে।
শেখ হাসিনা তো পালিয়ে বাঁচলেন; কিন্তু ধ্বংস করলেন তাঁর পিতা শেখ মুজিবকে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে অনেক ঘৃণা ছড়িয়েছিল। জিয়া যে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, সেটি অস্বীকার করা হয়েছিল। তাতে অনেকে মনে আঘাত পেয়েছিলেন। ফলে তার পাল্টা আঘাত তো আসবেই। সেটি এসেছে ৩২ নম্বরের বাড়ির ওপরে। ঘৃণার রাজনীতি দিয়ে সুস্থ কিছু হয় না।
@মহিউদ্দিন আহমদ
লেখক ও গবেষক