03/06/2026
চিনির স্বাদ মিষ্টি।
কিন্তু কিছু মিষ্টতার দাম এতটাই নির্মম যে তা জিভে নয়, বিবেকে গিয়ে লাগে।
ভারতের মহারাষ্ট্রের বিড জেলায় প্রচুর আখের চাষ হয়। প্রতি বছর শীত আসার আগে হাজারো দম্পতি সেখানে যান কাজে।
ভোর হওয়ার আগে শুরু, রাত নামলে শেষ। প্রতিদিন বারো থেকে চৌদ্দ ঘণ্টা, সপ্তাহে সাত দিন, একটানা ছয় মাস।
অসুস্থ হওয়ার অধিকার নেই। ছুটির কোনো ব্যবস্থা নেই। একদিন কাজে না গেলে যে জরিমানা করা হয় তা পুরো সপ্তাহের রোজগারের সমান।
এই ব্যবস্থায় একজন নারীর শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক চক্রেরও কোনো জায়গা নেই।
মাসিক হলে একটু বিশ্রাম দরকার। কিন্তু বিশ্রাম মানেই আয় কমে যাওয়া, ঋণের বোঝা বাড়া, সংসারের হিসাব ভেঙে পড়া।
তাই সমাধান খোঁজা হয়েছে।
সমস্যার নয়, শরীরের!
২০২৪ সালে, আখ কাটার মৌসুম শুরু হওয়ার ঠিক আগে, শুধু এই একটি জেলায় ৮৪৩ জন নারী জরায়ু অপসারণের অস্ত্রোপচার করিয়েছেন। এর মধ্যে ৪৭৭ জনের বয়স মাত্র ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ। তথ্যগুলো মহারাষ্ট্র সরকারের নিজস্ব স্বাস্থ্য জরিপের তথ্য।
সারা ভারতে ১৫ থেকে ৪৯ বছর বয়সী নারীদের মধ্যে এই অস্ত্রোপচারের হার ৩.২ শতাংশ।
বিড জেলার আখ কাটতে যাওয়া নারীদের মধ্যে?
৫৫.৭৩ শতাংশ।
প্রতি দুজনের মধ্যে একজনেরও বেশি।
ত্রিশ বছর বয়সেই জরায়ুহীন!
এই আখ থেকেই তৈরি হয় সেই চিনি, যা যায় Coca-Cola-তে, Pepsi-তে, Cadbury চকোলেটে, Unilever-এর অসংখ্য পণ্যে। আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা সাপ্লাই চেইন ধরে ধরে সেই সম্পর্কের প্রমাণ যথাযথভাবে তুলে ধরেছেন।
অথচ এই শিল্পের রয়েছে নৈতিকতার সনদ, সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রতিশ্রুতি, ঝকঝকে অডিট রিপোর্ট।
কাগজে সব ঠিকঠাক ছিল।
শুধু নারীদের শরীরগুলোই ঠিক ছিল না!
এরপর কী হলো?
কোনো কোনো কম্পানি একটি সরবরাহকারীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করল। কেউ সচেতনতা কর্মসূচি চালু করল। কেউ আইনি কৌশলে জবাবদিহি এড়িয়ে গেল। অগত্যা সরকার আরেকটি কমিটি গঠন করল — ২০১৯ সালের পর এটি দ্বিতীয়বার।
কিন্তু মাঠে আখ কাটা বন্ধ হয়নি।
চিনি আসা বন্ধ হয়নি।
আর নারীদের শরীরকে শ্রমের উপযোগী করে তোলার এই নিষ্ঠুর প্রক্রিয়াও থামেনি।।
আমরা শোষণকে কল্পনা করি কারখানার ধোঁয়া, শিশুশ্রম কিংবা শিকলের ছবিতে।
কিন্তু আধুনিক শোষণ অনেক বেশি পরিশীলিত। অনেক বেশি নীরব।
এখানে কাউকে বন্দুক দেখাতে হয় না।
ক্ষুধাই যথেষ্ট।
ঋণই যথেষ্ট।
দারিদ্র্যই যথেষ্ট।
মানুষকে এমন এক জায়গায় ঠেলে দেওয়া হয়, যেখানে নিজের শরীরের একটি অঙ্গ কেটে ফেলা আর বেঁচে থাকার শেষ কৌশলের মধ্যে আর কোনো পার্থক্য থাকে না।
প্রতিদিন যে চায়ে আমরা চিনি দিই, যে কোলায় চুমুক দিই, যে চকোলেটের মোড়ক ছিঁড়ি — সেগুলোর প্রকৃত দাম বাজারে লেখা থাকে না।
সেই দাম পরিশোধ করেন অন্য কেউ!
দূরের কোনো আখক্ষেতে রোদ মাথায় দাঁড়িয়ে থাকা একজন নারী।
নিজের শরীর বিসর্জন দিয়ে।
সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড আকাশচুম্বী ভবন নয়, প্রযুক্তির উৎকর্ষও নয়।
সভ্যতার প্রকৃত মানদণ্ড হলো — জীবিকার জন্য কোনো নারীকে নিজের জরায়ু বিসর্জন দিতে হয় কি না!
আজকের পৃথিবী সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে, নাকি ব্যর্থ হয়েছে এই প্রশ্নের উত্তরটা আমাদের সবারই জানা, তাই উত্তর খুঁজতে যাওয়া নেহাতই বোকামি!
Copy Post from