02/04/2026
ঘটনাটি আজকের। তখন দুপুর প্রায় দেড়টা বাজে। ওভার ফাস্টিং এর কারণে দুটো ব্লাড টেস্ট করাতে ব্যর্থ হয়ে রিক্সায় চেপে বাসা ফিরছিলাম। মিরপুর ১২ থেকে মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট যাবার জন্য বামদিকে যে রাস্তা আছে, তার কিছু আগেই একটা স্পিড ব্রেকার আছে। আমার রিক্সা স্পিড ব্রেকারে উঠার জন্য হালকা স্লো করেছে কি করে নাই, একটা দামি গাড়ি পেছন থেকে অত্যন্ত জোরে ধাক্কা দেয়। গাড়িটা খুবই হাই স্পিডে চলার কারণে স্পিডব্রেকার খেয়াল করে নাই। ব্রেক ধরতে দেরি হওয়ায়, রিক্সায় ধাক্কাটা এত জোরে লাগে যে আমি রিক্সা থেকে ছিটকে পড়ার উপক্রম হই। ভাগ্যিস শক্ত করে ধরে বসে ছিলাম। নয়তো, সেই দামি গাড়ির চাকার নিচে পড়তে হতো। এখন আসি মূল প্রসঙ্গে :-
গাড়ি চালাচ্ছিলেন গাড়ির মালিক। পরণে সিভিল পোশাক পরিহিত। গাড়ি থেকে হন্তদন্ত হয়ে নেমেই রিক্সাওয়ালাকে বললেন, "এই ব্যাটা, রিক্সা ভেতরে নে"। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে নিতে বলছিলেন। রিক্সাওয়ালার কোন দোষ নাই, গাড়িতে কোন স্ক্র্যাচ পড়ে নাই, উল্টো উনার চালানোর গাফিলতিতে একটা বড় দূর্ঘটনা হতে হতে বেঁচে গেলাম। তাই বললাম, 'রিক্সা ভেতরে কেন নেবে?' উনি আমাকে হাত দেখিয়ে থামিয়ে বললেন, "আপনি চুপ থাকেন। আমার গাড়িতে ভিডিও রেকর্ড আছে।" আমি বললাম, 'আপনি এত স্পিডে গাড়ি চালাচ্ছিলেন, এটা তো আপনার ফল্ট'। ভদ্রলোক রেগে আমাকে ধমকালেন, "আপনি নামেন রিক্সা থেকে। এক্ষন নামেন"। 'আমি রিক্সা ঠিক করেছি বাসা পর্যন্ত যাবার জন্য। রিক্সা যদি আটকে রাখেন, তাহলে আমাকে আরেকটা রিক্সা ঠিক করে দেন', আমি বললাম। ভদ্রলোক এত দামি একটা গাড়ি চালান, আর তাকে কিনা আমি রিক্সা ঠিক করে দিতে বলেছি, এটা হজম করতে পারেন নাই তিনি। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে রিক্সার হুডে ধাক্কা দেন। আমি রিক্সাতেই বসা, আমার মাথায় সজোরে রিক্সার হুডের আঘাত লাগে। "আমার মাথায় বাড়ি মারলেন কেন?" চিৎকার করতে থাকি। উনি বিন্দুমাত্র দুঃখিত না বরং রাস্তার জড়ো হওয়া মানুষকে বলতে থাকে, "মহিলা কিভাবে চিল্লাচ্ছে, দেখেন।"
সামনেই দুজন ভাই চলন্ত এক বাইকে ছিলেন। গন্ডগোল দেখে বাইক আগেই থামিয়ে ছিলেন। উনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম। গাড়ির মালিক ভদ্রলোক বললেন, "করেন চিৎকার। আমার কিচ্ছু করতে পারবেন না।" আঙুল দিয়ে ইশারা করে আরোও বলেন, "আরোও জোরে চিল্লান!" আমিও বললাম, "পাওয়ার দেখাচ্ছেন? জোর যার মুল্লুক তার? আমিও জানি আপনার কিছু হবে না। কিন্তু আমাকে বাড়ি মারলেন কেন?"
গাড়ির মালিক ক্যান্টনমেন্টের সামনে সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা দুজনকে (উনাদের র্যাঙ্ক জানি না) উদ্দেশ্য করে রিকশা আটকাতে বললেন। অভিযোগ দিলেন, রিক্সা ডান পাশে চাপিয়ে দেয়ার কারণে নাকি গাড়ির ধাক্কা লেগেছে। রিক্সাওয়ালাকে ধরতে হবে। আমি নাকি রিক্সাওয়ালাকে বাঁচাতে চাইছি! আমি বললাম, 'রিক্সাওয়ালা আমার আত্মীয় না, উনার পক্ষে কথা বললে আমাকে উনি ১০ টাকা দিবেও না। দোষ আপনার। আমি উচিত কথাই বলছি। কিন্তু জবাব দেন, আমাকে বাড়ি দিলেন কেন?'
আমার কথার জবাব না দিয়ে, উনি গাড়ি হাঁকিয়ে চলে গেলেন। যাবার আগে রিক্সা আটকে রাখতে বলে গেলেন। সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা ভদ্রলোক একজন এগিয়ে বললেন, "আসলে, ম্যাডাম..."। আমি থামিয়ে দিলাম। বললাম, 'আমি জানি আপনাদের হাত-পা বাঁধা। চাকরির খাতিরে অনেক কিছুই আপনাদের চুপ করে দেখতে হয়। আপনাদের জবাবদিহিতা আছে। ওই ভদ্রলোক অনেক ক্ষমতা দেখালেন, আমি কে বা কোন স্ট্যাটাসে বিলং করি, আমি কিন্তু এখনো কিছুই বলি নাই। উনি যেই হোন না কেন, আমাকে কেন বাড়ি দিবে?' কথার মাঝখানেই বাইকে বসা ভদ্রলোক এসে বললেন, উনি নিজে দেখেছেন, গাড়িটা কি মারাত্মকভাবে রিক্সার পেছনে এসে ধাক্কা দিয়েছে, রিক্সাওয়ালার দোষ নাই। তখন পথচারী আরেক ভাই এসে যোগ করলেন, গাড়ি যিনি চালাচ্ছিলেন, সে খুব বাজেভাবে রিক্সার হুডে ধাক্কা দেন এবং আমার মাথায় আঘাত লাগে।
সিকিউরিটির দায়িত্বে থাকা ভদ্রলোক আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, " আপনি কি চলে যেতে চাচ্ছেন?" আমি জানালাম যে, হ্যা, চলে যেতে চাচ্ছি। কিন্তু আমার কারণে তার চাকরির কোন ক্ষতি হোক সেটাও আমি চাই না। উনি ম্লান মুখে জানালেন, "আমার চাকরির কথা আপনাকে ভাবতে হবে না। চলে যান, ম্যাডাম। স্যরি।"
রিক্সাওয়ালাকে বললেন, "এই চলে যাও। এখানে যত বেশি থাকবা বিপদ বাড়বে।"
বিপদ না বাড়ানোর প্রত্যাশায় আমরা স্থান পরিত্যাগ করলাম। এভাবে পালিয়ে বিপদ এড়িয়ে কি সত্যিই বাঁচা যায়? কতদিন যায়?
এই স্ট্যাটাস লেখা পর্যন্ত আমার মাথায় এখনো টনটনে ব্যথা আছে। জখম নেই, রক্ত পড়ছে না, এর মানে এই নয় যে আমি ব্যথা পাইনি বা উনি এভাবে আমাকে আঘাত করতে পারেন। যে ভাইয়েরা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলে সাহায্য করলেন, তাদের প্রাপ্য ধন্যবাদটুকু দিতে পারি নাই বলে দুঃখিত। অসংখ্য ধন্যবাদ, যারা সত্যের পক্ষে ছিলেন।
আর আপনারা যারা কষ্ট করে লেখাটা পড়লেন, আপনাদেরও ধন্যবাদ। সবার প্রতি একটা অনুরোধ রইলো। অন্যায় দেখলে আওয়াজ তুলবেন, প্রতিপক্ষ যতই ক্ষমতাধর হোক না কেন! কেউ কিছু বলে না বলেই, এদের অন্যায়ের প্রবণতা দিন দিন বেড়েই চলে।