14/04/2026
দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারা: পরকীয়ার আইনী সংজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি (Penal Code), ১৮৬০-এর ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী পরকীয়াকে একটি অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। তবে এই আইনের কিছু সীমাবদ্ধতা ও বিতর্কিত দিক রয়েছে:
সংজ্ঞা: যদি কোনো ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তির স্ত্রীর সাথে তার স্বামীর সম্মতি ব্যতিরেকে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করে এবং তা যদি 'ধর্ষণ' না হয়, তবে সেটি পরকীয়া বা ব্যভিচার (Adultery) হিসেবে গণ্য হবে।
শাস্তি: এই অপরাধের জন্য দোষী ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
নারীর দায়মুক্তি: ৪৯৭ ধারার একটি বিতর্কিত অংশ হলো, এই অপরাধে প্ররোচনাকারী হিসেবে নারীকে সাজা দেওয়ার বিধান নেই। আইন অনুযায়ী, কেবল পুরুষটিই অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত হন। আপনি যেমনটি উল্লেখ করেছেন বাস্তবে নারী পুরুষ উভয়ই দায়ী থাকলেও, বিদ্যমান ব্রিটিশ আমলের এই আইনে নারীকে 'ভিকটিম' বা 'অসহায়' হিসেবে দেখা হয়েছে।
২. দণ্ডবিধির ৪৯৮ ধারা: প্রলুব্ধ করা বা নিয়ে যাওয়া
আপনি আপনার বক্তব্যে ৪৯৮ ধারার কথা উল্লেখ করেছেন। এই ধারাটি পরকীয়ার সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত:
যদি কোনো ব্যক্তি কোনো বিবাহিত নারীকে তার স্বামীর হেফাজত থেকে ব্যভিচার বা অবৈধ যৌন সম্পর্কের উদ্দেশ্যে প্রলুব্ধ করে বা নিয়ে যায়, তবে সেটি ৪৯৮ ধারার অধীনে অপরাধ। এক্ষেত্রেও সাজা সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড।
৩. পরকীয়া বনাম লিভ-টুগেদার (Live-in Relationship)
আইনী দৃষ্টিকোণ থেকে এই দুটির মধ্যে পার্থক্য অত্যন্ত স্পষ্ট:
লিভ-টুগেদার: বাংলাদেশের আইনে দুই জন প্রাপ্তবয়স্ক অবিবাহিত নারী ও পুরুষ যদি পারস্পরিক সম্মতিতে একত্রে বসবাস করে, তবে সেটিকে সরাসরি 'অপরাধ' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা কঠিন (যদি না সেখানে প্রতারণা বা অন্য কোনো অপরাধ থাকে)। এটি ব্যক্তিগত সত্তা বা ব্যক্তিগত পছন্দের পর্যায়ে পড়ে।
পরকীয়া: এটি একটি 'সিভিল রং' (Civil Wrong) এবং কিছু ক্ষেত্রে ফৌজদারি অপরাধ। কারণ এটি একটি বৈধ বৈবাহিক চুক্তির লঙ্ঘন। এটি কেবল একটি সম্পর্ক নয়, বরং একটি পরিবারের আইনী ও সামাজিক ভিত্তি নষ্ট করে দেয়।
৪. পারিবারিক আইনে পরকীয়ার প্রভাব
ফৌজদারি সাজার চেয়েও পরকীয়ার বড় আইনী প্রভাব পড়ে পারিবারিক আদালতে:
বিবাহবিচ্ছেদ (Divorce): কোনো স্ত্রী বা স্বামী যদি পরকীয়ায় লিপ্ত হন, তবে অপর পক্ষ এটিকে 'ক্রুয়েলটি' (Cruelty) বা নৈতিক স্খলন হিসেবে দেখিয়ে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করতে পারেন।
সন্তানের জিম্মা (Child Custody): পরকীয়ায় লিপ্ত থাকা বাবা বা মায়ের নৈতিক চরিত্র সন্তানের অভিভাবকত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আদালত সন্তানের 'সর্বোত্তম স্বার্থ' (Best interest of the child) দেখার সময় এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়।
দেনমোহর ও খোরপোশ: পরকীয়ার কারণে ডিভোর্স হলেও অনেক ক্ষেত্রে দেনমোহরের বাধ্যবাধকতা থাকে, তবে খোরপোশের ক্ষেত্রে কিছু আইনী জটিলতা তৈরি হতে পারে।
সামাজিক ও আইনী পর্যবেক্ষণ
শারীরিক তাড়না বা ক্ষণস্থায়ী মোহের জন্য এই পথে পা বাড়ায়, যার কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নেই। উচ্চ আদালত বিভিন্ন সময় মন্তব্য করেছেন যে, দণ্ডবিধির ৪৯৭ ধারাটি বর্তমান সময়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় (যেহেতু এটি কেবল পুরুষকে দায়ী করে)। এটি লিঙ্গ বৈষম্যমূলক এবং আধুনিক সময়ের সামাজিক বাস্তবতায় এই আইনের সংস্কারের দাবি উঠছে বারবার।
পরকীয়া শুধু একটি আইনগত অপরাধই নয়, এটি ব্যক্তিগত জীবনের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার অধিকারকেও বিপন্ন করে তোলে। সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় পারিবারিক মূল্যবোধ এবং বিদ্যমান আইনের সঠিক প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি।