08/06/2026
আবেগ বনাম আইন: বিচার কি জনমতের উপর নির্ভর করতে পারে?
কোনো নৃশংস হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, শিশু নির্যাতন কিংবা আলোচিত অপরাধের ঘটনা ঘটলে জনমনে তীব্র ক্ষোভ, বেদনা ও প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। মানুষ অপরাধীর দ্রুত ও কঠোর শাস্তি দেখতে চায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উত্তপ্ত হয়ে ওঠে, গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে জনমত এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে বিচার প্রক্রিয়ার উপরও তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়।
কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যায় আর তা হলো বিচার কি জনমতের উপর নির্ভর করতে পারে? নাকি বিচারকে অবশ্যই আইন, প্রমাণ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে পরিচালিত হতে হবে?
আবেগের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় নাঃ
প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে, আবেগ মানবিকতারই অংশ। একটি শিশুর হত্যাকাণ্ড, একজন নারীর উপর বর্বর নির্যাতন কিংবা কোনো অসহায় মানুষের প্রতি নির্মম আচরণ দেখে মানুষের বিবেক নাড়া দিবে এটিই স্বাভাবিক।
প্রকৃতপক্ষে অনেক ঐতিহাসিক সামাজিক পরিবর্তনের পেছনেও জনসচেতনতা ও জনমতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। জনমত রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনে, আইন সংস্কারের দাবি তোলে এবং অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
অতএব, জনমত অপ্রয়োজনীয় নয় বরং একটি গণতান্ত্রিক সমাজে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হয় তখনই যখন জনমত বিচারকের আসনে বসতে শুরু করে। অনেক সময় জনমনে একটি প্রশ্ন ওঠে “যদি অপরাধ এত স্পষ্ট হয় তাহলে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রয়োজন কী?” এর উত্তর হলো বিচারব্যবস্থা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের উপর নয় বরং প্রমাণের উপর দাঁড়িয়ে থাকে। তদন্তের ভুল, সাক্ষ্যের অসঙ্গতি, জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা ব্যক্তিগত শত্রুতার কারণে বহু দেশে ভুল বিচারের ঘটনা ঘটেছে। আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার সেই ঝুঁকি কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সুরক্ষা।
বিচার যখন আবেগের কাছে বন্দি হয়ে যায়ঃ
আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো কোনো ব্যক্তিকে কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে অপরাধী বলা যায় না। অপরাধ প্রমাণের দায়িত্ব রাষ্ট্রের এবং সেই প্রমাণ আদালতে গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে উপস্থাপন করতে হয়।
কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে প্রায়ই দেখা যায় তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই অভিযুক্তকে অপরাধী হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কখনও কখনও জনচাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই সমাজ একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছে যায়।
এ ধরনের পরিস্থিতি কয়েকটি গুরুতর ঝুঁকি সৃষ্টি করে:
* নিরপরাধ ব্যক্তি ভুলভাবে অভিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
* তদন্ত সংস্থার উপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়।
* আদালতের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে।
* বিচার নয়, প্রতিশোধের সংস্কৃতি তৈরি হতে পারে।
* ভবিষ্যতে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ বৃদ্ধি পায়।
ইতিহাস সাক্ষী অনেক দেশে জনমতের চাপে ভুল বিচার হয়েছে যা পরবর্তীতে প্রমাণিত হয়েছে।
আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার কেন অপরিহার্যঃ
সভ্য বিচারব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি হলো আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার।
যত বড়, যত ঘৃণ্য কিংবা যত আলোচিত অপরাধের অভিযোগই থাকুক না কেন অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনজীবী নিয়োগের অধিকার রয়েছে। কারণ আদালতের কাজ কোনো ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া নয় বরং আদালতের কাজ হলো সত্য উদঘাটন করা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।
অনেক সময় মানুষ প্রশ্ন করে “এত ভয়াবহ অপরাধীর পক্ষেও কেন আইনজীবী দাঁড়াবে?”
এর উত্তর হলো আইনজীবী অপরাধকে সমর্থন করেন না বরং তিনি নিশ্চিত করেন যে বিচার প্রক্রিয়া আইনসম্মতভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
যদি অভিযুক্তের পক্ষে কেউ না দাঁড়ায় তাহলে আদালত একপাক্ষিক তথ্যের উপর নির্ভর করতে বাধ্য হবে। আর একপাক্ষিক বিচার কখনোই ন্যায়বিচারের সমার্থক হতে পারে না।
রামিসা হত্যাকাণ্ড ও জনমতের প্রশ্নঃ
সম্প্রতি আলোচিত রামিসা হত্যাকাণ্ডের মতো হৃদয়বিদারক ঘটনা পুরো জাতিকে নাড়া দিয়েছে। একটি নিষ্পাপ শিশুর প্রতি এমন বর্বরতা মানুষের বিবেককে আহত করেছে এবং স্বাভাবিকভাবেই কঠোর শাস্তির দাবি উঠেছে।
এই ক্ষোভ ও বেদনা সম্পূর্ণ যৌক্তিক কিন্তু একই সঙ্গে এটিও মনে রাখতে হবে যে, বিচার প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ আইন অনুযায়ী সম্পন্ন হওয়া জরুরি। কারণ আজ যদি জনরোষের কারণে কোনো প্রক্রিয়া উপেক্ষা করা হয় তাহলে আগামীকাল সেই একই নজির অন্য কোনো নিরপরাধ মানুষের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য শুধু অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া নয় বরং নিশ্চিত করা যে প্রকৃত অপরাধীই শাস্তি পাচ্ছে।
উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতাঃ
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া এবং ইউরোপের অধিকাংশ দেশে আলোচিত অপরাধের ক্ষেত্রেও অভিযুক্তকে পূর্ণ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়।
সন্ত্রাসবাদ, গণহত্যা কিংবা সিরিয়াল কিলিংয়ের মতো ভয়াবহ অপরাধের ক্ষেত্রেও আদালত নিশ্চিত করে:
* দক্ষ আইনজীবীর সহায়তা,
* প্রমাণ যাচাইয়ের সুযোগ,
* সাক্ষী জিজ্ঞাসাবাদের অধিকার,
* স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনা,
* এবং আপিলের সুযোগ।
এ কারণে অনেক সময় বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ মনে হলেও ভুল বিচারের সম্ভাবনা কমে যায় এবং রায় অধিক গ্রহণযোগ্য হয়।
তবে ন্যায়বিচারের নামে দীর্ঘসূত্রিতাও গ্রহণযোগ্য নয়ঃ
অন্যদিকে ন্যায়বিচারের নামে এমন দীর্ঘসূত্রিতাও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না যার ফলে ভুক্তভোগী পরিবার বছরের পর বছর বিচারপ্রাপ্তির অপেক্ষায় থাকে অথবা প্রকৃত অপরাধী আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যায়।
বিচার যেমন তাড়াহুড়া করে করা উচিত নয় তেমনি অযৌক্তিক বিলম্বও ন্যায়বিচারের পরিপন্থী। আন্তর্জাতিক বিচারনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা হলো “Justice delayed is justice denied” অর্থাৎ অযথা বিলম্বিত বিচারও এক ধরনের বিচারহীনতা। বিচার বিলম্বিত হলে অনেক ক্ষেত্রে বিচার কার্যত অস্বীকৃত হয়ে যায়।
তাই একটি ভারসাম্য প্রয়োজন:
একদিকে অভিযুক্তের সাংবিধানিক ও মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে অন্যদিকে দ্রুত, কার্যকর এবং সময়সীমাবদ্ধ বিচার প্রক্রিয়াও নিশ্চিত করতে হবে। ন্যায়বিচার মানে শুধু Fair Trial নয় বরং একই সঙ্গে Timely Trial-ও।
সমাধানের পথঃ
এই ধরনের সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন:
* স্বাধীন ও পেশাদার তদন্ত ব্যবস্থা;
* রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপমুক্ত বিচারব্যবস্থা;
* দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের কার্যকর ব্যবহার;
* সাক্ষী ও ভুক্তভোগী সুরক্ষা ব্যবস্থা;
* বিচারিক প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার;
* জনসচেতনতা বৃদ্ধি;
* এবং আইনের শাসনের প্রতি সামাজিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা।
সবশেষে বলা যায়, আবেগ আমাদের মানুষ বানায় কিন্তু আইন আমাদের সভ্য করে।
জনমত রাষ্ট্রকে সচেতন করতে পারে, অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিক অবস্থান তৈরি করতে পারে কিন্তু আদালতের রায় নির্ধারণের দায়িত্ব জনমতের নয়। বিচার যদি আবেগের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে তাহলে একদিন সেই আবেগই নিরপরাধ মানুষকে অভিযুক্ত করবে। আবার বিচার যদি অকারণ দীর্ঘসূত্রিতার মধ্যে হারিয়ে যায় তাহলে প্রকৃত অপরাধী শাস্তি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
সুতরাং একটি সভ্য রাষ্ট্রের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যেখানে আবেগ মানবিক সচেতনতা সৃষ্টি করবে কিন্তু রায় নির্ধারণ করবে কেবল আইন, প্রমাণ এবং ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিমালা।
কারণ ন্যায়বিচারের প্রকৃত সৌন্দর্য প্রতিশোধে নয় বরং সত্য, নিরপেক্ষতা এবং ভারসাম্যের মধ্যেই নিহিত।
Barrister Md Sohrawardy Saddam
Barrister-at-Law (LincoIn's Inn)
LLB (Hons), LLM International Commercial Law
London South Bank University, UK.
Founder: Saddam Lawfinity Chambers
Email: [email protected]
Web: www.saddamlawfinity.com