27/10/2025
⃣ অবহেলা জনিত কারণে মৃত্যু: ইসলামিক শরীয়াহ ও দেশীয় আইন কী বলে?
এই বিষয়টি ইসলামী ফৌজদারি আইনে (فقه الجنايات) “খতা কতল” (قتل الخطأ) নামে পরিচিত — অর্থাৎ ভুলবশত বা অবহেলায় সংঘটিত হত্যা।
আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ أَنْ يَقْتُلَ مُؤْمِنًا إِلَّا خَطَأً ۚ وَمَنْ قَتَلَ مُؤْمِنًا خَطَأً فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مُؤْمِنَةٍ وَدِيَةٌ مُسَلَّمَةٌ إِلَىٰ أَهْلِهِ
“কোনো মুমিনের পক্ষে অন্য মুমিনকে হত্যা করা সম্ভব নয়, তবে যদি ভুলবশত ঘটে, তবে (হত্যাকারীর) কর্তব্য হলো একজন মুমিন দাসকে মুক্ত করা এবং নিহত ব্যক্তির পরিবারকে দিয়াত প্রদান করা।”
— সূরা আন-নিসা (৪:৯২)
⃣ অবহেলাজনিত (খাতা) হত্যার দায় ও ক্ষতিপূরণ
ইসলামী শরিয়তে অবহেলাজনিত হত্যার ক্ষেত্রে দুটি প্রধান দায় (দায়িত্ব) রয়েছে
🔹 (ক) দিয়াত (دية) — আর্থিক ক্ষতিপূরণ
অর্থাৎ রক্তমূল্য বা অর্থদণ্ড, যা নিহত ব্যক্তির পরিবারকে প্রদান করতে হয়।
পরিমাণ: নবী করিম ﷺ এর যুগে নির্ধারিত ছিল ১০০ উট।
আজকের কালে এটি উটের বাজারমূল্য অনুযায়ী অর্থমূল্যে পরিশোধ করা যায়।
দিয়াত প্রদানের দায় থাকে সাধারণত ‘আকিলা’ (عاقلة)-র ওপর — অর্থাৎ অপরাধী বা অপরাধীর নিকট আত্মীয় বা কুলগোষ্ঠীর ওপর।
🔹 (খ) কাফফারা (كفارة) —
ভুলক্রমে মৃত্যু ঘটালে দিয়াত প্রদানের পাশাপাশি অপরাধীর ওপর কাফফারা ফরয হয়।
অর্থাৎ —
১️⃣ একজন মুমিন দাস মুক্ত করা,
২️⃣ যদি তা না সম্ভব হয়, তাহলে দুই মাস ধারাবাহিক রোযা রাখা।
⃣ যদি নিহত ব্যক্তি অমুসলিম হয়?
সূরা আন-নিসা (৪:৯২)-এর শেষাংশে এসেছে —
“যদি নিহত ব্যক্তি তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ না করা কোনো অমুসলিম হয়, তবে তার পরিবারকেও দিয়াত দিতে হবে, এবং কাফফারা অবশ্যই আদায় করতে হবে।”
অর্থাৎ ধর্ম নির্বিশেষে অবহেলাজনিত হত্যার ক্ষেত্রে দিয়াত ও কাফফারা দুটোই প্রযোজ্য।
🌠 বাংলাদেশের দেশীয় (প্রচলিত) আইনে অবহেলায় জনিত দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ:
বাংলাদেশের দণ্ডবিধি (Penal Code, 1860) অনুযায়ী —
ধারা ৩০৪A (Section 304A): Causing death by negligence
“যে ব্যক্তি অবহেলা বা অসতর্কতার কারণে কোনো ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়,
যদি তার উদ্দেশ্য হত্যা না হয় বা মৃত্যু ঘটানোর অভিপ্রায় না থাকে,
তবে তাকে সর্বোচ্চ ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড,
বা জরিমানা,
অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে।”
অর্থাৎ, অবহেলায় দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে এটি ফৌজদারি অপরাধ (criminal offence)।
⃣ ক্ষতিপূরণের (Compensation) বিধান
বাংলাদেশের আইনে ক্ষতিপূরণ (compensation) সাধারণত দুইভাবে হতে পারে
🔹 (ক) আদালতের মাধ্যমে দেওয়ানি ক্ষতিপূরণ (Civil Remedy)
মৃত ব্যক্তির পরিবার আদালতে মামলা করতে পারে, যেমন “অবহেলার কারণে মৃত্যু ঘটায়, ফলে আর্থিক ও মানসিক ক্ষতি হয়েছে” — এই মর্মে দেওয়ানি মামলা (civil suit) করে ক্ষতিপূরণ দাবি করা যায়।
আদালত দুর্ঘটনার কারণ, অবহেলার মাত্রা, মৃত ব্যক্তির উপার্জনক্ষমতা, পারিবারিক ক্ষতি ইত্যাদি বিবেচনা করে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করে।
এটি দেওয়ানি আদালতের (Civil Court) এখতিয়ারে পড়ে।
📘 উদাহরণ:
যদি কোনো ড্রাইভার অসতর্কভাবে গাড়ি চালিয়ে মৃত্যু ঘটায়,
তাহলে মৃতের পরিবার মালিক বা বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণের মামলা করতে পারে।
🔹 (খ) মোটরযান আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ (Motor Vehicle Accident)
মোটরযান অধ্যাদেশ, 1983 (Motor Vehicles Ordinance, 1983)-এর ধারা 128 ও 129 অনুযায়ী —
দুর্ঘটনায় মৃত্যু বা আহত হলে,
নিহত ব্যক্তির পরিবার Claims Tribunal-এ ক্ষতিপূরণের দাবি করতে পারে।
ক্ষতিপূরণের মূল উৎস:
১. বীমা কোম্পানি (Insurance Company) — যদি গাড়ি বীমাকৃত থাকে
২. গাড়ির মালিক — যদি বীমা না থাকে
🍀ক্ষতিপূরণের পরিমাণ:
আদালত বা ট্রাইব্যুনাল মামলার প্রেক্ষিতে ক্ষতির ধরন ও আয় অনুযায়ী নির্ধারণ করে।
নির্দিষ্ট হার নেই, তবে বাস্তবে সাধারণত ২ থেকে ১০ লক্ষ টাকা বা তার বেশি পর্যন্ত হতে পারে।
আদালতের নজির অনুযায়ী,
একাধিক রায়ে দেখা যায় যে নিহতের পরিবারের আর্থিক ক্ষতি (যেমন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য হারানো) হিসাব করে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ হয়।
⃣ ক্ষতিপূরণের দাবিদার কারা?
নিহত ব্যক্তির—
স্ত্রী / স্বামী
পিতা-মাতা
সন্তান
অথবা আইনগত উত্তরাধিকারী (legal heirs)
এরা ক্ষতিপূরণের জন্য আদালতে আবেদন করতে পারেন।
Abubakar Siddique