07/11/2024
"১৯৭৫ এর ৩ থেকে ৭ নভেম্বর বন্দীদশা থেকে যেভাবে ক্ষমতায় জিয়াউর রহমান "
(১ম পর্ব)
পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর সিপাহী-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ববিরোধী এক ষড়যন্ত্র নস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল। এদিন সিপাহী-জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ক্যান্টনমেন্টের বন্দিদশা থেকে মুক্ত করে আনেন স্বাধীনতা যুদ্ধের মহান ঘোষক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে। এর আগে পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বর এক সামরিক অভ্যুত্থানে ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ক্ষমতা গ্রহণ করেন। নিজেকে মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করে চিফ অব আর্মি স্টাফ নিযুক্ত হন। এ সময় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাপ্রধান থেকে সরিয়ে বাসায় অন্তরীণ রাখা হয়। এই ৩ নভেম্বর থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে সরকার বলে কিছু ছিল না।
৭ নভেম্বর সম্পর্কে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘বাংলাদেশ এ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ বইয়ে লেখেন, ‘১৯৭৫ সালের ৫ ও ৬ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টসহ সারা শহরে ছড়ানো হলো হাজার হাজার প্রচারপত্র। এই কাজগুলো করল বামপন্থী জাসদ। এ সময় রাজনৈতিক দল জাসদ ছিল নিষিদ্ধ। কিন্তু তারা কাজ করছিল বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা এবং বিপ্লবী গণবাহিনীর আবরণে। একটি ব্যাপারে ডান ও বাম উভয় রাজনৈতিক দলই একমত ছিল, আর তা হচ্ছে—খালেদ মোশাররফ একজন বিশ্বাসঘাতক, ভারতের দালাল এবং সে ঘৃণিত বাকশাল ও মুজিববাদ ফিরিয়ে আনতে চাইছে।’
এতে সেদিনের ঘটনা উল্লেখ করে বলা হয়, ৭ নভেম্বর ভোরের দিকে জওয়ানরা ব্যারাক থেকে বেরিয়ে পড়ল। সারা ঢাকা শহরে এই ‘সিপাহী বিপ্লব’ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। রাত ১টার মধ্যেই সিপাহীরা পুরো ক্যান্টনমেন্ট দখল করে নিল। একদল জওয়ান গেল জেনারেল জিয়ার বাসভবনে। চারদিন বন্দি থাকার পর মুক্তি পেলেন জেনারেল জিয়া। নৈশ পোশাক পরা অবস্থাতেই জিয়াকে উল্লসিত জওয়ানরা কাঁধে করে নিয়ে গেল ২ ফিল্ড আর্টিলারির হেডকোয়ার্টারে। ঘটনার আকস্মিকতায় তখন বিহ্বল হয়ে পড়েন জিয়া। নাম না জানা অনেক জওয়ানের সঙ্গে আলিঙ্গন, করমর্দন করেন তিনি।
গ্রন্থটিতে আরও বলা হয়, ‘রেডিওতে ক্রমাগত সিপাহী-জনতার বিপ্লবের ঘোষণা এবং জেনারেল জিয়ার ক্ষমতা গ্রহণের খবর শুনে হাজার হাজার লোক স্রোতের মতো রাস্তায় নেমে এলো। তিনদিন ধরে তারা বিশ্বাস করছিল যে, ভারত খালেদ মোশাররফের মাধ্যমে তাদের কষ্টে অর্জিত স্বাধীনতাকে বিপন্ন করছে। এখন সেই দুঃস্বপ্ন কেটে গেছে। সর্বত্র জওয়ান এবং সাধারণ মানুষ খুশিতে একে অপরের সঙ্গে কোলাকুলি করল, রাস্তায় নামল। সারারাত তারা স্লোগান দিল, ‘আল্লাহু আকবর, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, সিপাহী বিপ্লব জিন্দাবাদ।’ অবস্থা দেখে মনে হচ্ছিল, ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের মতো এদেশের মানুষ আবার জেগে উঠেছে।
৬ নভেম্বর দিবাগত রাত ও ভোরে জনতার উল্লাসসহ বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরতে ৭ নভেম্বর টেলিগ্রাম প্রকাশ করে দৈনিক বাংলা। টেলিগ্রামের প্রধান শিরোনাম ছিল ‘আমাদের স্বাধীনতা রাখবোই রাখবো : জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহী জনতার বিপ্লব’। এছাড়া টেলিগ্রামে ‘আমি জিয়া বলছি’ ও ‘উল্লাসে উদ্বেল নগরী’ শিরোনামে দুটি প্রতিবেদনসহ আরও কয়েকটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এর পরদিন থেকে দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সংবাদসহ অন্যান্য পত্রিকা সিপাহী-জনতার বিপ্লব এবং সর্বস্তরের মানুষের অনুভূতি বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেসব প্রতিবেদনের কয়েকটি তুলে ধরা হলো :
আমাদের স্বাধীনতা রাখবোই রাখবো জিয়ার নেতৃত্বে সিপাহী-জনতার বিপ্লব
সিপাহী-জনতার মিলিত বিপ্লবে চারদিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর শেষ হয়েছে। মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সাময়িকভাবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত প্রায় ১টায় সশস্ত্র বাহিনীর প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনীর সিপাই জোয়ানরা বিপ্লবী অভ্যুত্থান ঘটায়।
শুক্রবার ভোরে এই রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত খবর : খন্দকার মোশতাক আহমদ সুস্থ রয়েছেন।
শুক্রবার সকালে রেডিও বাংলাদেশ থেকে ঘোষিত হয়— ষড়যন্ত্রের নাগপাশ ছিন্ন করে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে উদ্ধার করেছেন বিপ্লবী সিপাহীরা। এর কিছুক্ষণ পর জেনারেল জিয়া জাতির উদ্দেশে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।
মিছিল মিছিল আর মিছিল— বিপ্লবের, বিজয়ের, উল্লাসের মিছিল। স্লোগান আর স্লোগান— কণ্ঠের আর বুলেটের মিলিত স্লোগান। করতালি আর করতালিতে প্রাণের দুন্দুভী। আকাশে উিক্ষপ্ত লাখো হাত একের পর এক হচ্ছে প্রভাতের স্বর্ণ ঈগল। পথে পথে সিপাহী আর জনতা আলিঙ্গন করছে, হাত নেড়ে জানাচ্ছে অভিনন্দন— কাঁধে কাঁধ হাতে হাত— এক কণ্ঠে এক আওয়াজ— ‘সিপাহী-জনতা ভাই ভাই; জওয়ান জওয়ান ভাই ভাই; বাংলাদেশ জিন্দাবাদ; মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ; খন্দকার মোশতাক জিন্দাবাদ; আমাদের আজাদী রাখবোই রাখবো; হাতের সঙ্গে হাত মেলাও— সিপাহী-জনতা এক হও।’
এত আনন্দ, এত উল্লাস— সিপাহী ও জনতার হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের কোরাস, স্লোগানের মাঝে কামানের এমন অর্কেস্ট— এ এক অজানা ইতিহাস। সোমবার থেকে বৃহস্পতিবার— এই চারদিনের দুঃস্বপ্নের প্রহর পেরিয়ে এসেছে শুক্রবারের সোবেহ সাদেক, সিপাহী ও জনতার মিলিত বিপ্লব এনেছে শুক্রবারের বিজয়ের সূর্য। ঢাকা উল্লাসে টালমাটাল; বাংলাদেশ আনন্দে উদ্বেল। এই রিপোর্ট আমরা যখন লিখছি তখনো পথে পথে একের পর এক বিজয় মিছিল যাচ্ছে—ট্রাকে চেপে, পায়ে হেঁটে। সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ, আনসার ও দমকল বাহিনীর এক একটি দল যাচ্ছে—করছে রাজধানীর পথপরিক্রমা। তাদের সাথে এক ট্রাকে-লরীতে রয়েছে নানা স্তরের জনগণও। পথে পথে ঘুরছে ট্যাংক আর আর্মাড কার। পেছনে পেছনে জনতা। কোনো কোনো ট্যাংক ও আর্মাড কারেও জনতা উঠে বসেছে। স্লোগানে স্লোগানে আকাশে নিক্ষিপ্ত সিপাহীদের গুলিতে— আনন্দে-উচ্ছ্বাসে উদ্বেল নগরী।
শুরু অনেক আগে থেকেই— বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত প্রায় দুটো-আড়াইটা থেকে। ঢাকার জনগণ যখন বুঝতে পারলেন দুঃস্বপ্নের প্রহর শেষ হয়ে আসছে— শুরু হয়েছে সিপাহী বিপ্লব— তখন থেকেই তারা রাজপথে নামতে শুরু করেছেন। একপর্যায়ে দেখা গেল— ময়মনসিংহ রোডে হাজার হাজার লোক— নানা স্তরের নানা বয়েসী। সিপাহীরা তাদের পরিস্থিতি বুঝিয়ে বলেছেন। স্লোগান দিতে দিতে জনতা এগোচ্ছে ফার্মগেটের দিকে। রেডিও-ট্রানজিস্টারের পাশে জনতা উত্কর্ণ— মেজর জেনারেল জিয়া কখন ভাষণ দেবেন।
ভোর হলো। পথে পথে তখন জনতার জোয়ার। প্রাণের ঢল। ঢাকা নগরে তখন ছড়িয়ে গেছে বিজয়ের বারতা। পথের পাশে মোড়ে মোড়ে জনতা। সিপাহীরা ট্রাকের পর ট্রাকে লরির পর লরিতে যাচ্ছে। তারা উচ্চকণ্ঠে বলে যাচ্ছেন জয়ের কথা। পথের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের বক্তব্য রাখছে; স্লোগান দিচ্ছে আর তার সঙ্গে সঙ্গে স্লোগান জনগণের। বহু মহিলা এসে রাস্তার পাশে এখানে-সেখানে জড়ো হয়েছে। স্কুল ড্রেসপরা ছেলেমেয়েরা এখানে-সেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সারবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জনতা অভিনন্দন জানাচ্ছে, তাদের দিকে ফুল ছুড়ে দিচ্ছে, ফুলের মালা গলায় পরিয়ে দিচ্ছে। সিপাহীরা অভিনন্দন জানাচ্ছে জনতাকে। পথে পথে গাড়ি থেকে নেমে আলিঙ্গন করছে। তাদের দেয়া মালা পরিয়ে দিচ্ছে জনগণের গলায়। ব্যান্ড পার্টির বাদ্যের তালে তালে পথে পথে আনন্দনৃত্য করছে জনগণ। সকালে পথের পাশে এখানে-সেখানে লোকজন আল্লাহর দরবারে মোনাজাত করছে। কোথাও কোথাও সড়ক-দ্বীপে পথচারীরা মিলিত হয়েছেন তাত্ক্ষণিক মিলাদ মাহফিলে। (দৈনিক বাংলা, টেলিগ্রাম : ৭ নভেম্বর শুক্রবার, ১৯৭৫)
সংশয় ও দুঃস্বপ্নের মেঘ অতিক্রম করিয়া—ইত্তেফাক রিপোর্ট
সকল সংশয়, দ্বিধা আর দুঃস্বপ্নের মেঘ অতিক্রম করিয়া গত শুক্রবার বাঙ্গালী জাতির জীবনে এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব বিজয় সূচিত হইয়াছে।
এই বিজয়ে স্বর্ণোজ্জ্বল দলিলে জনতার প্রাণের অর্ঘ্য দিয়া লেখা হইল বাংলার বীর সেনানীদের নাম। আর দলিলের শিরোনামে শোভা পাইল একটি নাম— মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, বীরোত্তম, পিএসসি— একটি প্রিয় ও বিচক্ষণ ব্যক্তিত্ব। সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস, পুলিশ এবং আনসার বাহিনীর বীর সিপাহীদের এই জাগ্রত চেতনা, বৈপ্লবিক সত্তার এই প্রকাশ প্রমাণ করিল যে, বাঙ্গালী জাতির স্বাধীনতা খর্ব করার সাধ্য নাই কোন চক্রান্তের, কাহারো ক্ষমতা নাই দেশের সার্বভৌমত্বকে আঘাত করার, দুর্বল করার।
শুক্রবারের প্রভাত জাতির জন্য ছিনাইয়া আনে এক সূর্য-সম্ভব উজ্জ্বল ভবিষ্যত্, পরাভবহীন এক অপূর্ব আত্মপ্রত্যয়। সিপাহী-জনতার এই মিলিত আবেগ, উল্লাস, জয়ধ্বনি, আনন্দের কল-কল্লোল, সহস্র কণ্ঠের এই উচ্চকিত নিনাদ সেদিন ঘোষণা করিল সৈনিক ও জনতার একাত্মতা।
বিজয়োল্লাসে সমগ্র দেশবাসী যখন আনন্দে উদ্বেলিত, জেনারেল জিয়াউর রহমান তখন শান্তিপূর্ণভাবে যথাস্থানে নিজ নিজ দায়িত্ব পালনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী এবং সর্বস্তরের জনগণের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাইলেন। দেশের সর্বত্র অফিস, আদালত, যানবাহন, বিমানবন্দর, মিল-কারখানা পূর্ণভাবে চালু রাখার নির্দেশ প্রদান করিলেন। তাঁহার এই আহ্বান ও নির্দেশে সৈনিক ও জনগণ ফিরিয়া পাইল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা।
স্মরণীয় যে, গত আগস্ট মাসে সরকার পরিবর্তনের পর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সেনাবাহিনীর প্রধান পদে নিয়োগ করা হয়। গত সোমবার তিনি এক চক্রান্তের শিকার হইয়া আটক হন। কিন্তু বাংলার দেশপ্রেমিক বীর সিপাহীরা গত শুক্রবার প্রভাতে সমস্ত চক্রান্তের অবসান ঘটাইয়া তাহাদের প্রিয় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন এবং তাহাকে স্বীয় পদে বহাল করেন। সেনাবাহিনী আজ তাহার সুযোগ্য পরিচালনায় আস্থাশীল আর দেশবাসী সেনাবাহিনীর জাগ্রত চেতনা ও কর্তব্যবোধে নিশ্চিন্ত, আশাবাদী। (ইত্তেফাক : ৯ নভেম্বর বরিবার, ১৯৭৫)
//
সংগ্রহে: এডভোকেট কেএম সাইফুল ইসলাম।