21/07/2026
অর্পিত সম্পত্তি "খ তফসিল" বাতিলে: আপিল বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ রায়
________________________________
#সাইটেশন: 28 BLC (AD), P- 88
Civil Petition for Leave to Appeal No. 2310 of 2018
#কেন এই রায়টি গুরুত্বপূর্ণ?
এই রায়টি বাংলাদেশে অর্পিত সম্পত্তি (Vested Property) সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের আইনি অস্পষ্টতা দূর করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি নিশ্চিত করেছে যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর এবং ১৯৭৪ সালের আইনের পর নতুন করে কোনো সম্পত্তিকে 'শত্রু সম্পত্তি' বা 'অর্পিত সম্পত্তি' হিসেবে তালিকাভুক্ত করার কোনো বৈধতা নেই। এছাড়াও, এটি বিচার বিভাগ ও আইন বিভাগের ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং পারস্পরিক সম্পর্ক সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে।
#মামলার পটভূমি (Facts of the Case):
একজন বাংলাদেশি নাগরিক হাইকোর্ট বিভাগে একটি রিট পিটিশন দায়ের করেন, যেখানে তিনি ১৯৭৬ সালের একটি অধ্যাদেশ এবং ২০০১ সালের অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন-এর ৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেন।
তার মূল বক্তব্য ছিল যে, ১৯৬৫ সালের পাক-ভারত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে হিন্দু সংখ্যালঘুদের সম্পত্তিকে 'শত্রু সম্পত্তি' হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে, ১৯৭৪ সালের পর নতুন করে সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা এবং সরকারি দখলে রাখা এই মামলার প্রধান বিরোধের বিষয় ছিল।
#আইনি ইস্যু (Legal Issues)
১. একজন নাগরিকের এই আইনকে চ্যালেঞ্জ করার ল্যোকাস স্ট্যান্ডি (Locus Standi) বা মামলা করার আইনি অধিকার আছে কি না।
২. ২৩ মার্চ ১৯৭৪-এর পর কোনো সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা বৈধ কি না।
৩. হাইকোর্ট বিভাগ সরকার বা সংসদকে কোনো নির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিতে পারে কি না।
#উভয় পক্ষের যুক্তি:
#রিট আবেদনকারীর যুক্তি
রিট আবেদনকারীর বক্তব্য ছিল যে, ১৯৭৪ সালের পর এবং বাংলাদেশের সংবিধান কার্যকর হওয়ার পর নতুন করে কাউকে 'শত্রু' হিসেবে গণ্য করে তার সম্পত্তি রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেওয়া মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। এছাড়া, ২০০১ সালের আইনের কিছু ধারা প্রকৃত মালিকদের সম্পত্তি ফিরে পাওয়ার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
#সরকারের যুক্তি:
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, রিট আবেদনকারী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি নন, ফলে তার মামলা করার আইনগত অধিকার নেই। আরও বলা হয়, ১৯৭২ সালের President's Order No. 29 সংবিধানের প্রথম তফসিলে সুরক্ষিত থাকায় সেটিকে চ্যালেঞ্জ করা যায় না।
#আদালতের সিদ্ধান্ত:
✅আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া অধিকাংশ পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা Expunge করে দেয়।
✅তবে আদালত পুনরায় সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করে যে, ২৩ মার্চ ১৯৭৪-এর পর কোনো সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা আইনগতভাবে অবৈধ।
✅আদালত ২০০১ সালের অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন (২০১৩ সালে সংশোধিত) বহাল রাখে এবং মত প্রকাশ করে যে, এই আইনের মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য যথাযথ প্রতিকারের ব্যবস্থা বিদ্যমান।
আদালতের সিদ্ধান্তের কারণ:
১. আইন প্রণয়নের ক্ষমতা
আদালত বলেন, কোন আইন প্রণয়ন করা হবে বা একটি আইনের উদ্দেশ্য কী হবে, তা আইনসভার নীতিগত সিদ্ধান্ত। বিচার বিভাগ সংসদকে কোনো আইন প্রণয়নের নির্দেশ দিতে পারে না।
২. বিদ্যমান প্রতিকারের ব্যবস্থা
যেহেতু ২০০১ সালের আইনে নির্দিষ্ট ট্রাইব্যুনাল, আবেদন করার সময়সীমা এবং প্রতিকার পাওয়ার পদ্ধতি নির্ধারিত রয়েছে, তাই আদালতের অতিরিক্ত নির্দেশনার প্রয়োজন নেই।
৩. ল্যোকাস স্ট্যান্ডি
আদালত পুনর্ব্যক্ত করেন যে, জনস্বার্থে কিংবা সরকারি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ক্ষেত্রে একজন নাগরিক, যদি তিনি প্রকৃত অর্থে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি (Aggrieved Person) হন, তাহলে তিনি রিট আবেদন করতে পারেন।
#গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ:
✅আদালত মন্তব্য করেন যে, ১৯৬২ সালের পাকিস্তানের সংবিধান জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত না হওয়ায় তার গণতান্ত্রিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ ছিল।
✅আদালত ১৯৭৪ সালের Enemy Property (Repeal) Act-এর আইনগত প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ প্রদান করেন।
✅আদালত পুনর্ব্যক্ত করেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সংবিধানের মূলনীতির আলোকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো সকল নাগরিকের সমান অধিকার নিশ্চিত করা।
#প্রতিষ্ঠিত আইনি নীতি (Legal Principle Established):
এই রায়ের মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে,
২৩ মার্চ ১৯৭৪-এর পর যেকোনো সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা আইনত অবৈধ এবং অকার্যকর।
এছাড়া, এই সময়সীমা অমান্য করে কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে তা উপযুক্ত ক্ষেত্রে বিচারিক পর্যালোচনার আওতায় আসতে পারে।
#নাগরিক ও আইনজীবীদের জন্য ব্যবহারিক গুরুত্ব
#নাগরিকদের জন্য
নতুন করে কোনো সম্পত্তিকে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করার আশঙ্কা আইনগতভাবে দূর হয়েছে।
যারা ২৩ মার্চ ১৯৭৪-এর পর বেআইনিভাবে তালিকাভুক্তির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তারা বিদ্যমান আইনের অধীনে প্রতিকার চাইতে পারবেন।
#আইনজীবীদের জন্য
অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার ও কার্যপ্রণালী সম্পর্কে এই রায় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা প্রদান করেছে।
Locus Standi বিষয়ে আপিল বিভাগের আধুনিক ও বিস্তৃত ব্যাখ্যা ভবিষ্যতের সাংবিধানিক মামলাগুলোর জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।
চূড়ান্ত সারসংক্ষেপ:
এই রায়ের মাধ্যমে আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছে যে, অর্পিত সম্পত্তি আইন বাংলাদেশের একটি জটিল ঐতিহাসিক বাস্তবতার অংশ হলেও এর বর্তমান প্রয়োগ অবশ্যই সংবিধান, ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
রাষ্ট্র দাবিহীন অর্পিত সম্পত্তি আইন অনুযায়ী ব্যবস্থাপনা করতে পারবে, কিন্তু ২৩ মার্চ ১৯৭৪-এর পর কোনো সম্পত্তিকে নতুন করে অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই।
একই সঙ্গে, আপিল বিভাগ হাইকোর্ট বিভাগের কিছু প্রশাসনিক নির্দেশনা বাতিল করলেও ২৩ মার্চ ১৯৭৪-এর এই নির্ধারিত Cut-off Date-কে দৃঢ়ভাবে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে।
✍️______
সাদ্দাম হোসাইন আবির
অ্যাডভোকেট
বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।