12/01/2024
একজন আইনজীবী হিসেবে ফৌজদারী মামলা পরিচালনার ক্ষেত্রে মক্কেলদের কাছ থেকে আমি ব্যক্তিগতভাবে যে সকল প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি বা হচ্ছি সেই সকল প্রশ্নের মধ্যে থেকে সর্বোচ্চ রাঙ্কিং এর ১০ টি উল্লেখযোগ্য প্রশ্ন শেয়ার করতে চাই। উক্ত প্রশ্নের সম্ভব কিছু ব্যক্তিগত মতামত ভিত্তিতে উত্তর প্রদান করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং যা আমি সচরাচর (ক্ষেত্রবিশেষে) বিভিন্ন ক্লাইন্টদেরকে দিয়ে থাকি তা আজ উক্ত পোষ্টের মাধ্যমে শেয়ার করলাম। উল্লেখ্য যে, ১০ টি প্রশ্নের মধ্যে প্রথম ৫টি প্রশ্নের উত্তর পোস্ট করা হয়েছে, বাকিগুলো এই পোস্টে প্রদান করা হচ্ছে ইনশাআল্লাহ।
প্রশ্নগুলো হল:
(১)-(৫) এই লিংকে- https://www.facebook.com/61555300383089/posts/pfbid02vhJZmXCUhWiCe9DahtGnrKfSVpV7jgLLEuJiRL4Bve1AH5irVrEW6tGLo6eTm2FJl/?app=fbl
৬। মামলায় কী কী অধিকার রয়েছে?
৭। মামলা করে বিপত্তিতে পড়তে হবে না তো অথবা বিপরীত পক্ষ বাধা দিতে পারে?
৮। মামলায় কত খরচ হয়?
৯। মামলা শেষ হতে কত সময় লাগে?
১০। মামলায় কী কী ফলাফল হতে পারে?
৬। মামলায় কী কী অধিকার রয়েছে?
=> সাধারণত ফৌজদারী মামলায় আদালত আসামীকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে দন্ডবিধি অনুসারে অথবা ফৌজদারি অন্যান্য আইন অনুসারে শাস্তি মূলত পাঁচ প্রকার দিতে পারে।
1) মৃত্যুদণ্ড,
2) যাবজ্জীবন।
3) কারাবাস। কারাবাস আবার দুই প্রকার - সশ্রম কারাবাস, বিনাশ্রম কারাবাস,
4) অর্থদন্ড( অর্থদণ্ড অনাদায় বিনাশ্রম করাবাস),
5) সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত।
তবে জেনে রাখা ভালো যে, মামলার শুরুতে একজন আসামীকে কিছুদিন হাজত বাস করালেও বাদী পক্ষ মনে করে এটাই তার শাস্তি। মূলত শাস্তি পায় রায়ের পরে। প্রাথমিকভাবে যে হাজতবাসটা খাটে সেটি মূলত আইনের বিধান মোতাবেক জামিন অযোগ্য ধারার একটি বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করে মামলা প্রেক্ষিতে, ঘটনা প্রেক্ষিতে আসামীকে নির্দিষ্ট কাস্টডি অতিক্রম করতে হয়। এটিই হলো সে হাজতবাসটা বাস।
৭। মামলা করে বিপত্তিতে পড়তে হবে না তো অথবা বিপরীত পক্ষ বাধা দিতে পারে?
=> ফৌজদারী মামলায় যখন একটি সাধারণ সামাজিক নুইসেন্স বা সমাজ ও আইন-শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে এমন কাজের বিপরীতে কেউ মামলা করলে অপরপক্ষ উক্ত মামলা সম্পর্কে জেনে হয় সেটেলমেন্ট করার চেষ্টা করে, না হয় ভিন্ন কোন প্রক্রিয়ায় মামলার মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে, না হয় কাউন্টার মামলা করে বসে থাকে। আইনের কিছু নির্দিষ্ট ধারায় সেটেলমেন্ট করার সুযোগ আইন এবং আদালত দিয়ে থাকেন এবং তা সেটেলমেন্ট করাই উত্তম। সেটেলমেন্ট বলতে আপোষ মীমাংসা। আপোষ মীমাংসা স্থানীয় ব্যক্তির মাধ্যেমে হয়ে থাকে, আদালতের মাধ্যমে হয়ে থাকে, আইনজীবীদের মাধ্যমেও হয়ে থাকে। তবে সকল মামলায় সেটেলমেন্ট আইন দেয়নি। যৌতুক নিরোধ আইনের মামলা, পারিবারিক সহিংসতার মামলা, চেকের মামলা, চুক্তি ভঙ্গের দরুন ফৌজদারি অপরাধের মামলায় সেটেলমেন্ট সবচাইতে বেশি হয়ে থাকে।
মার্ডার মামলা, ডাকাতি মামলা, চাঁদাবাজি মামলা ইত্যাদি সব মামলার সেটেলমেন্ট আইন সিদ্ধ নয় এবং আইন সমর্থন করেনা।
মামলা ভিন্ন খাতে ভিন্ন মোড়ে নিয়ে যাওয়া এবং কাউন্টার মামলার ফলাফল এ দুটি আইনের ভাষায় সহজ ভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হয়ে উঠে না। বরং স্থান, কাল, পাত্র, ঘটনা, ক্লায়েন্ট বেসিসের উপর নির্ভর করে বলতে হয়।
৮। মামলায় কত খরচ হয়?
=> এ প্রশ্নটি সবচাইতে বেশি সংখ্যক মানুষের মনে এবং জানার আগ্রহ বেশি থাকে। মূলত দিনশেষে বেশিরভাগ ন্যায় বিচার প্রার্থীরা এই প্রশ্নের উত্তরের উপর নির্ভর করে মামলা করার সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। মামলার নির্দিষ্ট খরচ সম্পর্কে সাধারণ আইডিয়া দিতে পারলেও তা কখনো এক্সাক্ট আইডিয়া হতে পারে না। ঢাকা শহর ও প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চল দুটির মাঝে জীবন জীবিকা এবং মানুষের সমস্যা ও তার সমাধান ভিন্নতর। ঠিক তেমনই মামলার খরচ স্থান প্রেক্ষিতে, আইনজীবী প্রেক্ষিতে, মামলার পরিচালনার জন্য সুবিধা অসুবিধা প্রেক্ষিতে খরচে তারতম্য হয়ে থাকে। উদাহরণস্বরূপ বলতে গেলে মামলার খরচটি আপনি চিকিৎসা খরচের সাথে বিবেচনা করলে বিষয়টি আপনার জন্য সহজ হয়। আপনার একটি শরীরের রোগব্যাধি নিরাময়ের জন্য চিকিৎসা দরুন প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাক্তার এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং হাসপাতালের খরচ এর চেয়ে ঢাকা চট্টগ্রাম শহর অঞ্চলের খরচ কয়েক গুণ বেশি আবার আপনি যদি বিদেশে গিয়ে রোগ নিরাময় করতে চান সে ক্ষেত্রে খরচের ব্যাপ্তি বাকি দুটির চেয়ে অনেক গুণ বেশি। কিন্তু দিনশেষে সাবজেক্ট কিন্তু এইকাই - শরীরের রোগ নিরাময় করতে চাচ্ছেন । আপনি কিভাবে, কোথায়, কার মাধ্যমে এই কাজ করতে চাইছেন সেইটাই খরচের মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
প্রশ্নটির উত্তর সহজভাবে দেওয়ার চেষ্টা করার কারণে এই ধরনের উদাহরণ টানা হলো। উক্ত বিষয়ে বিভিন্ন মানুষের বিভিন্ন মতামত থাকতে পারে এবং প্রশ্ন থাকতে পারে যা আপনি জানাতে পারেন জিজ্ঞেস করতে পারেন কমেন্ট বক্সে।
৯। মামলা শেষ হতে কত সময় লাগে?
=> এই প্রশ্নটিও খরচ সম্পর্কিত প্রশ্নের মতই খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ফৌজদারী মামলা দীর্ঘায়িত হওয়ার দরুণ বাদী আর মামলা পরিচালনা করতে চান না এবং অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় ন্যায় বিচারের উপর তার আস্থার কমতি ঘটে। মামলা শেষ হতে কত সময় লাগে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার ক্ষেত্রে দুটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টা সহজ করে বোঝানো যাবে বলে আমি মনে করি ।
প্রথম উদাহরণ - একটি যৌতুক নিরোধ আইনের মামলায় বাদী এবং আসামী কয়েকটি তারিখের মধ্যে হয় আপোষে চলে আসেন, না হয় দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়ে যার যার মত ভাল থাকার চেষ্টা করেন। সেক্ষেত্রে দেখা যায় সাধারণত এসব মামলা তিন থেকে ছয় মাসের ভেতরে একটি কাঙ্খিত গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়। তবে ব্যতিক্রমও রয়েছে।
দ্বিতীয় উদাহরণ - একটি চেকের মামলা যেখানে আপনি একজন ব্যক্তিকে টাকা ধার দিয়েছেন এবং উক্ত টাকা পরিশোধ করিবার নির্মিত্তে একটি চেক প্রদান করেছে। সঠিক সময়ে টাকা পাননি এবং আপনি চেকের মামলা করেছেন। এই চেকের মামলায় আসামী রায়ের আগের দিন পর্যন্ত সেটেলমেন্টের সুযোগ পায়। যেহেতু সেটেলমেন্টের সুযোগ আইনে দিয়েছে এবং রায়ের আগের দিনও তা করা সম্ভব সেহেতু দেখা যায় যে আসামী মামলাটি দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করে। আইনগত সকল প্রসিডিউর কমপ্লিট করে(সাক্ষী - জেরা - সাফাই সাক্ষী - যুক্তিতর্ক ) সর্বশেষে টাকা দিতে চাই। কারণ যতদিন টাকা তার হাতে থাকবে ততদিন উক্ত টাকার মাধ্যমে সে তার নিজের কাজে লাগাতে পারবে।
উক্ত দুটি উদাহরণ সচরাচর বোধগম্য তাই যথাযোগ্য ধারণা লাভ করার খাতিরে দেওয়া হয়েছে।
তবে সময় সম্পর্কিত সঠিক ধারণা লাভের জন্য আইনজীবীর সাথে খোলাখুলি আলোচনা করাটাই যুক্তিসঙ্গত বলে আমি মনে করি।
১০। মামলায় কী কী ফলাফল হতে পারে?
=> ফৌজদারী মামলায় প্রতিটি ধারায় তার শাস্তি সম্পর্কিত বিধান নির্দিষ্ট করে দেওয়া আছে। মামলা করার পূর্বে বিজ্ঞ আইনজীবীর নিকট হতে মামলা পরিচালনাকারী ভালোভাবে জেনে নেওয়া জরুরী। মামলার সর্বশেষ স্তরে রায়ের পর্যায়ে বিজ্ঞ আদালতের বিচারিক দক্ষতা প্রয়োগ করে মামলা সর্বোচ্চ শাস্তি বা ওই ধরনের শাস্তি যা যথেষ্ট বলে তিনি মনে করেন তা দিয়ে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ বলতে গেলে একটি চুরির মামলায় তিন বছরের শাস্তি উল্লেখ করা থাকলেও বিজ্ঞ আদালত এক বছর অথবা দেড় বছর অথবা তিন বছর সম্পূর্ণরূপে শাস্তি দিতে পারেন। আদালত তার বিচারিক দক্ষতা ক্ষমতা ব্যবহার করে উক্ত রায় দিয়ে থাকেন। একজন আইনজীবী মামলার পরিচালনার বিষয়টি কৌশলগত নিয়ম অনুসারে পরিচালনা করে থাকেন। বাদী সাক্ষী প্রদান করিবেন, অন্যান্য সাক্ষীরা সাক্ষী প্রদান করিবেন, আসামীপক্ষ সাক্ষীদের জেরা করিবেন এবং আসামী পক্ষ নিজের ডিফেন্স তৈরি করবেন। উক্ত সকল কিছু বিবেচনা করে বিজ্ঞ আদালত রায় ঘোষণা করবেন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: উক্ত প্রশ্ন এবং উত্তর আমার ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নেওয়া ও দেওয়া। অ্যাডভোকেট-ক্লায়েন্ট প্রিভিলেজ উইথড্রো করে কোন কিছু প্রদান করা হয়নি।