14/08/2026
আইনজীবী ও বিচারপ্রার্থীদের কাছে দেওয়ানী মোকদ্দমা (Civil Suit) মানেই যেন এক দীর্ঘ মেয়াদী লড়াই। প্রবাদ আছে "যে শুরু করে, সে শেষ দেখে যেতে পারে না"
দেওয়ানি মোকদ্দমা বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকার পিছনে অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ কারণের মধ্যে অন্যতম হলো জনগণের সচেতনতার অভাব। মোকদ্দমা দায়ের করে অন্যের উপর দায়িত্ব দিয়ে নাকে সরিষার তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকার কারণে একটা মোকদ্দমা বারবার খারিজ হতে থাকে। আমরা সাধারণ জনগণ যদি একটু সচেতন হই তাহলে মোকদ্দমা নিষ্পত্তি যেমন বাড়বে তেমনি ছোটখাটো বিষয় নিয়ে মোকদ্দমা করার প্রবণতাও কমবে এবং একই সাথে দূর্নীতিও নির্মূল হবে।
একটি দেওয়ানি মোকদ্দমার ৩ টি পর্যায় রয়েছে।
যথা:
1. প্রাক বিচার পর্যায় (Pre-Trial Stage)
2. বিচার পর্যায় (Trial Stage)
3. বিচার পরবর্তী পর্যায় (Post-trial Stage)
এই ৩ টি পর্যায়ে আবার কিছু ছোট ছোট ধাপ রয়েছে। যথা:
১। প্রাক-বিচার পর্যায় (Pre-trial Stage)
◾আরজি দায়ের: দেওয়ানি মোকদ্দমা যে দায়ের করেন তাকে 'বাদী' বলা হয় এবং যার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় তাকে 'বিবাদী' বলা হয়। যে বিষয়টি নিয়ে বাদী-বিবাদীর মধ্যে বিরোধ বেঁধেছে আরজিতে তার বর্ণনা থাকবে।
◾বিবাদীর প্রতি সমন ইস্যু ও জারি: আদালতে যখন আরজি গৃহীত হয় তখন বাদীর দাবীর বিষয়টা জানানোর জন্য বিবাদীকে আদালতে হাজির হতে হয়। এই হাজির হওয়ার জন্য আদালতের মাধ্যমে সমন দেওয়া হয়। গ্রাম অঞ্চলে আদালতের লোক দেখলে জনসাধারণ মানুষ ভয়ে সমন নেয় না বা অন্যভাবে জারী করা হয়। এর ফলে সমন জারীতে অনেক সময় ব্যয় হয়ে যায় নতুবা মোকদ্দমাটি একতরফায় চলে যায়। যার ফলে পুনরায় নতুন মোকদ্দমার জন্ম হয়।
◾বিবাদীর হাজিরা ও লিখিত জবাব দাখিল: বিবাদী সমন পেয়ে জানতে পারে যে কোনো এক বা একাধিক ব্যক্তি কোনো বিষয় নিয়ে তার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা করেছে। তখন বিবাদী আদালতে উপস্থিত হয়ে এবং লিখিত জবাব দিয়ে বাদী আরজিতে যেসব বিষয় দাবী করেছে সেগুলোর ব্যাখ্যা দিবে।
◾মধ্যস্থতা বা বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি: অনেক সময় ভুল বুঝাবুঝি বা অন্য কোনো ব্যক্তিগত কারণে হেনস্তা করার জন্য মোকদ্দমা করে বসে। পরে আফসোস হয় কিন্তু উভয়পক্ষের ইগোর কারণে কেউই পিছিয়ে আসে না। এই পরিস্থিতি যাতে সৃষ্টি না হয় সেজন্য মীমাংসা বা মধ্যস্থতার ব্যবস্থা করা হয়। তবে মধ্যস্থতার বিষয়ে পক্ষরা আগ্রহ প্রকাশ করে না; করলেও অদৃশ্য একটা শক্তি তাদের থামিয়ে দেয়।
◾ ইস্যু গঠন: পক্ষরা মধ্যস্থতা না করলে মোকদ্দমাটির ইস্যু বা বিচার্য বিষয় গঠন করা হয়। Suppose: বাদী বললো নালিশী জমিতে আমার স্বত্ব ও দখল আছে। অন্যদিকে বিবাদী বললো নালিশী জমিতে বাদীর না, আমার স্বত্ব ও দখল আছে। সেক্ষেত্রে ইস্যু হতে পারে- নালিশী জমিতে বাদীর স্বত্ব ও দখল আছে কিনা? এছাড়াও আরো কিছু ইস্যু গঠন করা হয়। যেমন: তামাদি দোষ আছে কিনা না? পক্ষদোষে বারিত কিনা?
◾আবিষ্কার, পরিদর্শন ও স্বীকৃতি, ৩০ ধারার তলব ইত্যাদি।
◾ এস ডি (Settling Date for PH) বা চূড়ান্ত শুনানির দিন ধার্যকরণ: এই স্তরে এসে দেওয়ানি মোকদ্দমা দীর্ঘদিন ঘুমিয়ে থাকে। এই স্তরকে দেওয়ানি মামলার বিশ্রামাগার বললেও ভুল হবে না। সাধারণত বেশিরভাগ এজলাস শেয়ার করা লাগে, সেজন্য বিচারকরা ফুলটাইম এজলাসে সময় না দিতে পারার কারণে প্রতিদিন ডাইরি, কজলিস্টে বেশি মামলা রাখতে পারে না। তাছাড়া সকল কোর্টে PO না থাকার কারণেও কোর্টগুলো চার্জে থাকে বলে নতুন কোনো মোকদ্দমা SD থেকে PH পর্যায়ে তোলা হয়না।আরো কিছু কারণ রয়েছে।
২। বিচার পর্যায় (Trial Stage)
◾চূড়ান্ত শুনানি (পিএইচ বা এফপিএইচ): এই পর্যায়ে সাক্ষীদের জবানবন্দী ও দলিলপত্র দাখিল এবং জেরা করা হয়। (এই পর্যায়ে জনসাধারণ সচেতন হলে দ্রুত মোকদ্দমা নিষ্পত্তি সম্ভব)
◾যুক্তিতর্ক শুনানি: এই পর্যায়ে আসলে আদালতেরই সময় থাকে না। কারণ সাক্ষী নিতে নিতে সময় চলে যায় যুক্তিতর্ক শোনার মতো সময় থাকে না। সেজন্য রায় দিতে অনেক লেট হয়। এজলাস সংকট কমলে এই সমস্যার সমাধান হবে।
◾রায় বা আদেশ প্রদান (ডিক্রি বা খারিজের): যুক্তিতর্ক শোনার পরই রায় দেওয়া হয়। রায়ে বাদীর দাবী প্রমাণিত হলে ডিক্রি প্রধান করা হয় এবং বাদী তার দাবী প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলে মোকদ্দমাটি খারিজ করা হয়।
◾ডিক্রি প্রস্তুতকরণ: রায় দেওয়ার ৭ দিনের মধ্যে ডিক্রি প্রদান করা হয়।
৩। বিচার পরবর্তী পর্যায় (Post-trial Stage)
◾ডিক্রি জারিকরণ: আদালত যে ডিক্রিটি প্রদান করলো তার বাস্তবায়ন। যেমন: নালিশী জমিতে ঘরবাড়ি থাকলে তা ভেঙ্গে বাদীকে সেই জমি প্রদান করা।
◾আপিল: যে পক্ষ হেরে যায় সে আপিল দায়ের করে থাকে।
◾ রিভিউ।
◾রিভিশন ।
আইন জানুন, নিজেকে নিরাপদ রাখুন।
ইয়ামিন হোসেন পিয়াস
এ্যাডভোকেট
জেলা ও দায়রা জজ আদালত, ভোলা।