31/08/2026
চেকের মামলায় নোটিশ পাননি কিংবা ভুল ঠিকানায় নোটিশ পাঠিয়েছে? কিভাবে মামলা বাতিল কিংবা খারিজ হতে পারে জেনে নিন!
আপনার নামে যদি চেক বাউন্সের (চেক ডিজঅনার) মামলা হয়ে থাকে, তাহলে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। এই মামলায় জেতার একটা বড় সুযোগ লুকিয়ে থাকে একটা জায়গায় — "নোটিশ" ঠিকমতো আপনার কাছে পৌঁছেছিল কিনা।
আইন বলে — শুধু চেক বাউন্স হলেই কেউ ফৌজদারি অপরাধী হয়ে যায় না। বাদী (যিনি মামলা করেছেন) আগে আপনাকে লিখিত নোটিশ দিয়ে টাকা পরিশোধের সুযোগ দিতে বাধ্য। এই নোটিশ যদি ঠিকমতো না পৌঁছায়, বা পৌঁছানোর প্রমাণ না থাকে — তাহলে গোটা মামলাই ভেঙে পড়তে পারে।
নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা অনুযায়ী, বাদীর চেক ব্যাংক থেকে ফেরত (ডিজঅনার) হওয়ার পর তাকে ৩০ দিনের মধ্যে আপনাকে লিখিতভাবে জানাতে হবে যে — "আপনার চেক ফেরত এসেছে, টাকা দিন।"
এই নোটিশ পাঠানো কোনো সাধারণ নিয়ম নয় — এটা বাধ্যতামূলক শর্ত। এই শর্ত পূরণ না হলে মামলা দাঁড়াতেই পারে না।
সহজ করে বললে — নোটিশ হলো মামলার "প্রবেশদ্বার"। দরজাই যদি ঠিক না থাকে, তাহলে ভেতরে ঢোকার প্রশ্নই আসে না। এম.এ লতিফ বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য মামলা যা ৩৯ বিএলডি (২০১৯) ২২২ (হাইকোর্ট বিভাগ।
আসামি হিসেবে আপনি আদালতে নিচের যেকোনো একটি বা একাধিক পয়েন্ট তুলে ধরতে পারেন:
ক) আপনি যদি সত্যিই কোনো নোটিশ না পেয়ে থাকেন, তাহলে সরাসরি বলুন — "আমি কোনো নোটিশ পাইনি।" বাদীকেই প্রমাণ করতে হবে যে তিনি নোটিশ পাঠিয়েছেন এবং সেটা আপনার কাছে পৌঁছেছে। মোঃ আজহার আলী বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য মামলা, ৬৪ ডিএলআর (২০১২) ২৫৫
খ) বাদী শুধু মুখে বললেই হবে না যে তিনি নোটিশ পাঠিয়েছেন। তাকে আদালতে দেখাতে হবে: একনলেজমেন্ট ডিউ কার্ড বা "এডি কার্ড" (যা প্রমাণ করে চিঠি হাতে পৌঁছেছে) সঠিক ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে তার প্রমাণ
এসবের কোনোটা যদি না থাকে বা কোনো গরমিল থাকে, তাহলে আপনি এই দুর্বলতা আদালতে তুলে ধরতে পারবেন।
গ) নোটিশ যদি আপনার পুরনো ঠিকানায়, ভুল বাড়িতে বা এমন কোনো ঠিকানায় পাঠানো হয় যেখানে আপনি থাকেন না — তাহলে সেটা "যথাযথভাবে জারি" হয়েছে বলে গণ্য হবে না।
ঘ) নোটিশ যদি পিয়ন বা প্রসেস সার্ভারের মাধ্যমে পাঠানো হয়ে থাকে, আর তার রিপোর্টে কোনো অসংগতি বা ভুল থাকে, সেটাও আপনার পক্ষে যুক্তি হতে পারে।
উচ্চ আদালত একাধিক মামলায় স্পষ্ট করে বলেছে যে —
নোটিশ জারিতে কোনো যৌক্তিক সন্দেহ তৈরি হলে, সেই সন্দেহের সুবিধা আসামিই পাবেন — বাদী নয়।
শুধু রেজিস্ট্রি ডাকে চিঠি পাঠানো হলেই একটা প্রাথমিক ধারণা তৈরি হয় যে সেটা পৌঁছেছে, কিন্তু এই ধারণা চ্যালেঞ্জ করা যায় এবং প্রমাণ দিয়ে ভুল প্রমাণিত করা যায়।
কাউকে টাকা পরিশোধের সুযোগ না দিয়ে সরাসরি ফৌজদারি মামলায় জড়ানো ন্যায়বিচারের পরিপন্থী।
এই ধরনের ভুলকে আদালত ছোট বা "টেকনিক্যাল" ভুল হিসেবে দেখে না — এটাকে মৌলিক ত্রুটি হিসেবে গণ্য করা হয়, যার ফলে সরাসরি খালাস হতে পারে। অর্থাৎ, আইন ও আদালত — দুটোই এই জায়গায় আসামিকে সুরক্ষা দেয়।
উকিলকে খুলে বলুন — নোটিশ পেয়েছেন কিনা, কবে পেয়েছেন, কোন ঠিকানায় পাঠানো হয়েছিল বলে বাদী দাবি করছে, আপনি তখন সেখানে ছিলেন কিনা। মামলার নথিতে বাদীর পাঠানো পোস্টাল রসিদ, এডি কার্ড, বা ঠিকানা প্রমাণ আছে কিনা যাচাই করুন।
জেরায় (ক্রস-এক্সামিনেশনে) প্রশ্ন তুলুন — বাদী বা তার সাক্ষীকে জিজ্ঞাসা করান, নোটিশ ঠিক কবে, কোন ঠিকানায়, কীভাবে পাঠানো হয়েছিল, আর তার প্রমাণ কী।
নিজের ঠিকানার প্রমাণ দিন — যদি ভুল ঠিকানায় নোটিশ পাঠানো হয়ে থাকে, তাহলে আপনার প্রকৃত ঠিকানার প্রমাণ (ভোটার আইডি, বিদ্যুৎ বিল ইত্যাদি) আদালতে দাখিল করুন।
সময়ের হিসাব রাখুন — চেক বাউন্সের কত দিন পর নোটিশ পাঠানো হয়েছে, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। দেরিতে নোটিশ পাঠানো হলে সেটাও আইনি ত্রুটি হতে পারে।
নোটিশ ছাড়া মামলা টেকে না — এটাই মূল কথা। বাদীর দায়িত্ব প্রমাণ করা যে নোটিশ সঠিকভাবে পাঠানো ও পৌঁছানো হয়েছে — আপনার দায়িত্ব নয় প্রমাণ করা যে পাননি।
সন্দেহ তৈরি করতে পারলেই তার সুবিধা আপনি পাবেন।
এটা কোনো ফাঁকফোকর নয় — এটা আইনের স্পষ্ট বিধান এবং আদালতের স্বীকৃত নীতি।
চেকের মামলায় ভয় পাওয়ার আগে দেখে নিন — নোটিশ ঠিকমতো এসেছিল কিনা, কোন ঠিকানায় এসেছিল, আর বাদীর কাছে তার সঠিক প্রমাণ আছে কিনা। এই একটা জায়গা ধরেই অনেক নির্দোষ মানুষ মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।